২০২৫ সাল বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের জন্য ছিল গভীর উদ্বেগ ও ক্ষতের বছর। বাউল সম্প্রদায় থেকে শুরু করে গণসংগঠন, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান এবং স্বাধীন গবেষণামূলক শিল্পচর্চা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই এ বছর বাধা, হামলা ও দমনমূলক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে দেশ। সংস্কৃতির বহমান ধারায় এই বছর যে আঘাত এসেছে, তা শুধু শিল্পীদের নয়, সামগ্রিকভাবে সমাজের মানবিক ও মুক্তচিন্তার ভিতকেই নাড়িয়ে দিয়েছে।
বছরের বিভিন্ন সময়ে এক শ্রেণির লোক দেশের নানা স্থানে মাজারে হামলা চালিয়েছে। এসব হামলা কেবল ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রশ্নই তোলে না, বরং লোকজ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। গত সেপ্টেম্বরে রাজবাড়ীতে নুরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে পুড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা দেশজুড়ে ক্ষোভ ও বিস্ময়ের জন্ম দেয়। সর্বশেষ গত শুক্রবার ঠাকুরগাঁওয়ে বাবা শাহ সত্যপীরের মাজারে হামলার ঘটনা প্রমাণ করে, এই প্রবণতা থামেনি।
মানিকগঞ্জে বাউল শিল্পী আবুল সরকারের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে তাঁর অনুগামীদের ওপর হামলার ঘটনাও ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন স্থানে বাউল ও লোকসংগীত শিল্পীদের হুমকি দেওয়া, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া এবং অপমানজনক আচরণের ঘটনাও ঘটেছে। শাহবাগে ‘গানের আর্তনাদ’ নামে আয়োজিত বাউল ও লোকসংগীত কর্মসূচিতে হামলার প্রতিবাদে যে আয়োজন করা হয়েছিল, সেটিও পণ্ড করে দেওয়া হয়। একইভাবে দেশের কয়েকটি স্থানে নাটক মঞ্চায়ন স্থগিতের ঘটনাও সংস্কৃতিকর্মীদের হতাশ করেছে।
২০২৫ সালের মার্চে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সংগীত ও শরীরচর্চা শিক্ষক নিয়োগ বাতিলের সিদ্ধান্ত সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে শঙ্কা তৈরি করে। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নাগরিক গ্রুপ এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ-সমাবেশ করে। তখন বক্তারা জোর দিয়ে বলেন, সাংস্কৃতিক শিক্ষা ও সৃজনশীলতার বিকাশই জাতীয় চেতনা, মানবিক মূল্যবোধ এবং সহনশীল সমাজ গঠনের ভিত্তি। অথচ বছরজুড়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতেও উল্লেখযোগ্য কোনো মঞ্চনাটক বা বড় আয়োজন দেখা যায়নি, যা সাংস্কৃতিক স্থবিরতার ইঙ্গিত দেয়।
বাউল সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো ২০২৫ সালে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ময়মনসিংহের তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জ বাজারে বাউল ফকির নামে পরিচিত বৃদ্ধ হালিম উদ্দিন আকন্দের মাথার জট জোর করে কেটে দেওয়ার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন ব্যক্তি তাঁকে ধরে রেখে জোরপূর্বক চুল কেটে দিচ্ছে। সেই সময় তাঁর মুখ থেকে বেরিয়ে আসে অসহায় আর্তি—‘আল্লাহ, তুই দেহিস!’ এই দৃশ্য বহু মানুষের হৃদয়কে নাড়া দেয়। ঘটনার পর তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং এখন আর বাইরে বের হতে চান না।
বছরের শেষে ডিসেম্বর মাসে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে। ১৮ ডিসেম্বর রাতে ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। পরদিন সন্ধ্যায় উদীচীর কার্যালয়ে আগুন দিলে সংগঠনের ৫৭ বছরের নথিপত্রসহ সবকিছু পুড়ে ছাই হয়ে যায়। নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে একাধিক বিদেশি শিল্পীর কনসার্ট বাতিল করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও নেতিবাচক বার্তা দেয়।
সব মিলিয়ে ২০২৫ সালে সাংস্কৃতিক অঙ্গন ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হয়েছে। সহিংসতা, হুমকি ও মানসিক চাপ শিল্পী ও সংস্কৃতিকর্মীদের স্বাধীন সৃজনশীলতাকে সংকুচিত করেছে। তবে এর মধ্যেও প্রতিরোধের চিত্র দেখা গেছে। বাউলদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে, নাগরিক সমাজ প্রতিবাদ জানিয়েছে। এই প্রতিরোধই আশা জাগায়—সংস্কৃতির ওপর আঘাত যতই আসুক, তার আত্মা পুরোপুরি নিভে যাবে না।
বিথী রানী মণ্ডল/










