দেশ পুনর্গঠন ও জাতি গঠনের কাজে প্রত্যেক নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সক্রিয় ভূমিকা রাখার আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, দেশকে নতুনভাবে গড়ে তুলতে হলে সবার সম্মিলিত দায়িত্ববোধ প্রয়োজন। যার যতটুকু সক্ষমতা আছে, তাকে ততটুকুই দায়িত্ব নিতে হবে। এমনকি রাস্তায় পড়ে থাকা একটি কাগজও নিজ উদ্যোগে পরিষ্কার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
তারেক রহমান বলেন, “আমাদের যার যতটুকু অবস্থান আছে, সেখান থেকে আসুন আমরা আমাদের দেশটাকে নতুন করে গড়ে তোলার চেষ্টা করি। যার পক্ষে যতটুকু সম্ভব আমরা চেষ্টা করি।” সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) বিকেলে রাজধানীর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছে বারান্দা থেকে নিচে উপস্থিত নেতাকর্মীদের উদ্দেশে এসব কথা বলেন তিনি।
নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে সড়কে সৃষ্ট যানজটের বিষয়টি উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, যেহেতু এদিনে দলের কোনো আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি নেই, তাই সাধারণ মানুষের ভোগান্তি এড়াতে সবাইকে রাস্তা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ জানান তিনি। নেতাকর্মীদের উপস্থিতির কারণে সাধারণ মানুষের চলাচলে ব্যাঘাত ও যানজট সৃষ্টি হচ্ছে উল্লেখ করে তিনি সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।
এর আগে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে গুলশানের বাসভবন থেকে তারেক রহমানের গাড়িবহর নয়াপল্টনের উদ্দেশে রওনা দেয়। প্রায় একযুগ পর নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। নেতাকর্মীদের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রবেশ করতে তার প্রায় আধাঘণ্টা সময় লাগে। এ সময় নেতাকর্মীরা তারেক রহমানকে অভ্যর্থনা জানিয়ে স্লোগান দিতে থাকেন— “তারেক রহমান বীরের বেশে, আসছে ফিরে বাংলাদেশে; তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম; তারেক রহমান এসেছে, রাজপথ হাসছে; বাংলাদেশের প্রাণ, তারেক রহমান।” স্লোগানগুলোতে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন, নেতৃত্ব ও জনপ্রিয়তার কথা তুলে ধরা হয়। এর আগে বেলা ৩টার দিকে গুলশান এভিনিউয়ে অবস্থিত বাসভবন থেকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দেন তারেক রহমান।
বিকেল ৪টার দিকে নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পৌঁছালে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী এবং কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ফুল দিয়ে তাকে স্বাগত জানান। এ সময় বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুস সালাম, যুগ্ম মহাসচিব হাবিবুন্নবী খান সোহেলসহ দলের অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
তারেক রহমানের আগমন উপলক্ষ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় বর্ণিল সাজে সাজানো হয়। সকাল থেকেই নয়াপল্টন এলাকায় বিএনপির হাজার হাজার নেতাকর্মীর জমায়েত শুরু হয়। নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ব্যাপক প্রাণচাঞ্চল্য লক্ষ্য করা যায়।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় কার্যালয় ঘিরে সিএসএফ মোতায়েন করা হয়। পাশাপাশি পুরো নয়াপল্টন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর নজরদারি জোরদার করে। র্যাবের ডগ স্কোয়াড দিয়ে কার্যালয় ও আশপাশের এলাকায় তল্লাশিও চালানো হয়।
দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরে যেন এক মুহূর্তের জন্যও বিশ্রামের সুযোগ পাচ্ছেন না বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণের পর থেকেই দলীয় নেতাকর্মীদের আবেগ, উচ্ছ্বাস ও টানা কর্মসূচির ভিড়ে পুরো সময়জুড়ে তাকে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেছে। দেশে ফেরার এই ঘটনাকে ঘিরে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক ধরনের উৎসবমুখর পরিবেশ।
বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) দুপুর ১১টা ৪০ মিনিটে তারেক রহমানকে বহনকারী ফ্লাইটটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করে। বিমানবন্দরে তাকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে তার স্ত্রী ডা. জুবেদা রহমান ও একমাত্র কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমানকেও আনুষ্ঠানিকভাবে অভ্যর্থনা জানানো হয়। এ সময় দলের স্থায়ী কমিটির সদস্যসহ কেন্দ্রীয় পর্যায়ের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বের হওয়ার আগে দূর্বা ঘাসে পা রেখে তারেক রহমান কিছু সময় দেশের স্মৃতিতে ডুবে থাকেন। এরপর তিনি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। দুপুর ১২টা ৩৫ মিনিটে ‘বাংলাদেশ’ লেখা একটি লাল বাসে উঠে তিনশ’ ফিট এলাকায় নির্ধারিত সংবর্ধনাস্থলের উদ্দেশে রওনা দেন তিনি। তবে পথে পথে নেতাকর্মীদের ব্যাপক ভিড়, স্লোগান ও শুভেচ্ছায় গাড়িবহর ধীরগতিতে চলতে থাকে। মাত্র ২০ মিনিটের পথ পাড়ি দিতে সময় লাগে প্রায় সোয়া তিন ঘণ্টা। এ সময় গাড়ির সামনের গ্লাস দিয়ে হাত নেড়ে নেতাকর্মীদের অভিবাদন জানাতে দেখা যায় তাকে।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর সংবর্ধনাস্থলে পৌঁছে মঞ্চে ওঠেন তারেক রহমান। নির্ধারিত আসনে না বসে সাধারণ একটি চেয়ারে বসে তিনি নেতাকর্মীদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। তার বক্তব্যে উঠে আসে দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তার ভাবনা ও পরিকল্পনার কথা। তরুণ প্রজন্মকে সামনে রেখে দেওয়া ১৬ মিনিটের বক্তৃতায় ছিল উদারতা, সহনশীলতা ও নতুন রাজনৈতিক ভাষার প্রতিফলন। ভাষাশৈলী ও শব্দচয়নের নতুনত্ব নেতাকর্মীদের মধ্যে আশার সঞ্চার করে।
দেশে ফেরার দ্বিতীয় দিন শুক্রবার (২৬ ডিসেম্বর) সকালে তিনি গুলশানের বাসভবন থেকে শেরে বাংলা নগরের উদ্দেশে রওনা দেন। পথে পথে নেতাকর্মীদের ভিড়ের কারণে মাত্র ২০ মিনিটের পথ অতিক্রম করতে সময় লাগে সোয়া এক ঘণ্টা। শেরে বাংলা নগরে পৌঁছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। প্রথমে দলের মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্যদের সঙ্গে একযোগে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন, পরে এককভাবে শ্রদ্ধা জানান। ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাতে অংশ নিয়ে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি।
এরপর তিনি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে রওনা দেন। তবে পথে নেতাকর্মীদের ভিড় ও যানজটের কারণে সূর্যাস্তের আগে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। ফলে নিয়ম অনুযায়ী তার পক্ষে বিএনপির সিনিয়র নেতারা বিকাল ৫টা ৬ মিনিটে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে রাত ১০টা ৪ মিনিটে তারেক রহমান নিজে স্মৃতিসৌধে পৌঁছে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। সেখানে তিনি পরিদর্শন বইয়ে নিজের পরিচয় ‘রাজনৈতিক কর্মী’ হিসেবে উল্লেখ করে স্বাক্ষর করেন। রাত প্রায় ১২টার দিকে তিনি গুলশানের বাসভবনে ফিরে যান।
দেশে ফেরার তৃতীয় দিন শনিবার (২৭ ডিসেম্বর) সকালে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শহীদ শরীফ ওসমান হাদির কবর জিয়ারত করেন তারেক রহমান। সকাল ১০টা ৪০ মিনিটে গুলশান থেকে রওনা হয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদের পাশে হাদির কবরস্থানে পৌঁছান। সেখানে তিনি ফাতেহা পাঠ করেন ও মোনাজাতে অংশ নেন। এ সময় বিএনপির শীর্ষ নেতাদের পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান এবং ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম উপস্থিত ছিলেন।
হাদির কবর জিয়ারত শেষে দুপুরে তিনি আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের পেছনে নির্বাচন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটে (ইটিআই) যান। সেখানে মাত্র ১৮ মিনিটে তার ভোটার নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। অনলাইন ফরম পূরণের মাধ্যমে তিনি ও তার কন্যা জাইমা রহমান ঢাকা-১৭ আসনের ভোটার হিসেবে নিবন্ধিত হন। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তারা জাতীয় পরিচয়পত্র পাবেন।
ভোটার নিবন্ধন শেষে তারেক রহমান বনানী কবরস্থানে গিয়ে ছোট ভাই প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর কবর জিয়ারত করেন। পাশাপাশি তিনি তার শ্বশুরের কবরও জিয়ারত করেন। এরপর বিকেলে তিনি গুলশান ও ধানমন্ডিতে পারিবারিক সময় কাটান।
তিন দিনের টানা কর্মসূচি শেষে শনিবার রাতে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। তিনি লেখেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর মাতৃভূমিতে ফিরে পাওয়া মানুষের ভালোবাসা, দোয়া ও সম্মান তার জীবনের জন্য অবিস্মরণীয় হয়ে থাকবে। তিনি ঐক্যবদ্ধ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয় পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, দেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি বাস্তব ও দায়িত্বশীল পরিকল্পনা নিয়েই তিনি সামনে এগিয়ে যেতে চান।
আফরিনা সুলতানা ও সাবরিনা রিমি/










