আখলাক হলো মানুষের স্বভাব, আচরণ, শিষ্টাচার, নৈতিকতা এবং সামগ্রিক চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। এটি মানুষের কথা ও কাজের মাধ্যমে প্রকাশিত মানবিক গুণাবলিকে বোঝায়, যার দুটি প্রধান প্রকারভেদ হলো ভালো (আখলাকে হামিদাহ) ও খারাপ (আখলাকে যামিমা), এবং উত্তম আখলাক বা সচ্চরিত্র (আখলাকে হাসানা)। একজন মুসলিমের ঈমানের পূর্ণতার জন্য অপরিহার্য, যা সততা, দয়া, ক্ষমা ও ওয়াদা পালনের মতো নৈতিক গুণাবলিকে অন্তর্ভুক্ত করে ভালো ও প্রশংসনীয় গুণাবলি, যেমন: সততা, সত্যবাদিতা, দয়া, ক্ষমা, বিনয়, ওয়াদা পালন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদি।
উত্তম আখলাক সুন্দর স্বভাব চরিত্র ধারণ করা একজন মুসলিমের জন্য অপরিহার্য। এছাড়া তার ঈমান ইসলাম অপূর্ণ থেকে যাবে। এ নিবন্ধে আমরা উত্তম আখলাকের মর্যাদা ও প্রাপ্তির কয়েকটি দিক বর্ণনা করব। তবে তার পূর্বে এ সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা জরুরি।
কোন মুসলিম যখন অন্য মানুষের সাথে উত্তম আচরণ করছেন, সুন্দর স্বভাব চরিত্র দিয়ে নিজেকে আলোকিত করছেন, এর পেছনে কী উদ্দেশ্য থাকবে, তিনি কেন এই চর্চাটা করবেন?
বস্তুত এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশনা খুবই পরিষ্কার। ইসলামের দৃষ্টিতে উত্তম আখলাক হচ্ছে, অন্যতম একটি নেক কাজ। আর যে-কোনো নেক কাজ করার মূল উদ্দেশ্য হতে হবে— আল্লাহ তায়ালার নির্দেশনা পালন করে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তাঁর একান্ত অনুগত বান্দা হয়ে উঠা।
কোরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে এভাবে শিখিয়েছেন,
قُلۡ إِنَّ صَلَاتِی وَنُسُكِی وَمَحۡیَایَ وَمَمَاتِی لِلَّهِ رَبِّ ٱلۡعَـٰلَمِینَ
আপনি বলুন, আমার নামাজ, ইবাদত বন্দেগি, আমার বেঁচে থাকা এবং আমার মৃত্যু, এসবই জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য নিবেদিত। (সূরা আনআ’ম : ১৬২)
উত্তম আখলাকের মর্যাদা
উত্তম আখলাক যেহেতু ইসলামের অতীব গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, সেজন্য এর ফজিলত সওয়াব ও মর্যাদাও অপরিসীম। এ ব্যাপারে বিপুল আয়াত ও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। এখানে খুব সংক্ষেপে উত্তম আখলাকের মর্যাদার কয়েকটি দিক তুলে ধরছি।
আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা অর্জন
উত্তম আখলাক এর অন্যতম একটি মর্যাদা হচ্ছে, এর মাধ্যমে একজন মানুষ আল্লাহ পাক ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিতে পরিণত হয়ে যায়। অর্জন করে আল্লাহ ও তাঁর মহান রাসূলের ভালোবাসা।
নবীজি বলেছেন,
আল্লাহর নিকট তার বান্দাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সবচে প্রিয়—যার আখলাক স্বভাব চরিত্র সবচে সুন্দর। (মুস্তাদরাকে হাকেম : ৮২১৪)।
অপর একটি হাদিসে নবীজি বলেছেন,
তোমাদের মধ্যে যারা আমার সবচেয়ে প্রিয় এবং কেয়ামতের দিন যারা আমার সবচেয়ে নিকটে আসন লাভ করবে, তাদের অন্যতম হচ্ছে— সে সকল ব্যক্তি যারা স্বভাব-চরিত্রের বিচারে তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। (তিরমিজি : ২০১৮)।
বলার অপেক্ষা রাখে না, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের ভালোবাসা অর্জন করা এবং কিয়ামতের দিন নবীজির সবচেয়ে কাছে থাকতে পারা একজন মুমিনের জন্য সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। যার কোন তুলনা হয় না।
ইমানের পূর্ণতার নিদর্শন
দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, উত্তম আখলাক হল একজন মুমিনের ঈমানী পূর্ণতার একটি বিশেষ নিদর্শন। হাদিসের ভাষ্য হচ্ছে,
মুমিনদের মধ্যে যার আখলাক সবচে সুন্দর, সেই সবচেয়ে’ পূর্ণাঙ্গ ইমানের অধিকারী। (আবু দাউদ : ৪৬৮২)।
মিজানের পাল্লায় সবচে ভারী বস্তু উত্তম আখলাক
আমরা এই পৃথিবীতে ভালো-মন্দ যা কিছু করছি, কেয়ামতের দিন এসব কিছু দাড়ি পাল্লায় ওজন করা হবে। সেই ওজনে যার নেকির পাল্লা ভারী হবে, সেই হবে সম্মানিত, জাহান্নামের আজাব থেকে মুক্তি লাভ করে জান্নাতের উত্তম জীবন লাভ করবে। (সূরা আরাফ : ০৮, সূরা আল কারিয়া : ৬-৭)।
এখন জানার বিষয় হল, সেই দাঁড়িপাল্লায় সবচেয়ে ভারী জিনিস কী হবে? এ ব্যাপারে নবীজি বলেছেন,
কেয়ামতের দিন মিজানের পাল্লায় সবচেয়ে ওজনদার বস্তু হবে উত্তম আখলাক সুন্দর চরিত্র। (তিরমিজি : ২০০২)।
ঘর বাড়ি আবাদ হয়, হায়াতে বৃদ্ধি ঘটে
আয়েশা সিদ্দিকা রাঃ থেকে মুসনাদে আহমাদে উত্তম আখলাকের আরেকটি মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। এ হাদিসে নবীজী বলেন,
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা প্রতিবেশীর সাথে সুসম্পর্ক রাখা এবং উত্তম আখলাক ধারণ করা— এগুলো ঘরবাড়িকে আবাদ রাখে এবং মানুষের হায়াতে বৃদ্ধি ঘটায়। (মুসনাদে আহমদ : ২৫২৫৯)।
নফল নামাজ ও রোজা রাখার মর্যাদা
এখানেই শেষ নয়, উত্তম আখলাকের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফজিলত হচ্ছে— এর মাধ্যমে একজন মুমিন নফল নামাজ ও রোজা রাখার মর্যাদা লাভ করতে পারে। সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত এক হাদিসে নবীজী বলেন,
একজন মুমিন তার উত্তম আখলাক চরিত্র দ্বারা রাতে নামাজ আদায়কারী ও দিনে রোজা পালনকারী ব্যক্তির মর্যাদা অর্জন করে। (হাদিস : ৪৭৯৮)।
জান্নাতের সুউচ্চ আসন লাভ
এ সকল কারণে যে কয়েকটি বিষয় মানুষকে সবচেয়ে বেশি হারে জান্নাতে নিয়ে যাবে, হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী উত্তম আখলাকও তার মধ্যে অন্যতম। মহান সাহাবী আবু হুরায়রা রাঃ বর্ণিত হাদিসে এসেছে,
খোদাভীতি আর উত্তম আখলাক মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করাবে। (তিরমিজি : ২৬৪২)।
শুধু জান্নাতেই প্রবেশ নয়, নবীজি বলেছেন যে ব্যক্তি তার আচরণকে সুন্দর করবে আমি তার জন্য জান্নাতের সর্বোচ্চ ঘরবাড়ির দায়িত্বশীল হয়েছি। (আবু দাউদ : ৪৮০০)।
আমাদের জীবন সুবাসিত হোক উত্তম আখলাকের সৌরভে, মহান আল্লাহর কাছে, এই মোনাজাত করি। আমিন।
মামুন/










