ফুটবল মাঠের ক্যানভাসে যিনি পায়ের জাদুতে আঁকতেন অসাধ্য সব আল্পনা, সেই ‘পিকাসো’ চিরতরে তুলি নামিয়ে রাখলেন। ইংল্যান্ডের অন্যতম প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী ক্লাব নটিংহাম ফরেস্টের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম নায়ক, স্কটিশ উইঙ্গার জন রবার্টসন আর নেই। তাঁর প্রয়াণে কেবল একটি ক্লাবের কিংবদন্তি নয়, বরং ফুটবলীয় রোমান্টিকতার এক বর্ণিল অধ্যায়ের অবসান ঘটল।
কিংবদন্তি ও ব্রায়ান ক্লাফের সেই জাদুকর নটিংহাম ফরেস্টের ইতিহাসে ব্রায়ান ক্লাফ যদি হন ‘মাস্টারমাইন্ড’, তবে জন রবার্টসন ছিলেন তাঁর সেই জাদুকরী অস্ত্র, যা দিয়ে তিনি জয় করেছিলেন ইউরোপ। সত্তরের দশকের শেষভাগে এক সাধারণ ক্লাব থেকে নটিংহাম ফরেস্টের ইউরোপসেরা হওয়ার রূপকথা রবার্টসন ছাড়া অসম্ভব ছিল। ক্লাফ নিজেই তাঁকে আদর করে ডাকতেন ‘ফুটবলের পিকাসো’। কারণ, মাঠের বাঁ-প্রান্ত দিয়ে রবার্টসনের বল নিয়ে এগিয়ে যাওয়া ছিল কোনো শিল্পীর নিপুণ তুলির টানের মতো।
ইউরোপ জয়ের সেই ঐতিহাসিক মুহূর্ত নটিংহামের ইতিহাসে দুটি ইউরোপীয় কাপ (বর্তমান চ্যাম্পিয়নস লিগ) জয়ের নেপথ্যে রবার্টসন ছিলেন মধ্যমণি। ১৯৭৯ সালের ফাইনালে তাঁর নিখুঁত ক্রস থেকে গোল করেছিলেন ট্রেভর ফ্রান্সিস। আর ১৯৮০ সালের ফাইনালে হামবুর্গের বিপক্ষে জয়সূচক সেই ঐতিহাসিক গোলটি এসেছিল খোদ রবার্টসনের পা থেকেই। ক্লাবের হয়ে ৫১৪ ম্যাচে ৯৫টি গোল করা এই ফুটবলার কেবল পরিসংখ্যান দিয়ে বিচার্য নন; তিনি ছিলেন সিটি গ্রাউন্ডের দর্শকদের আবেগ আর আস্থার প্রতীক।
কেন তিনি অনন্য? আধুনিক ফুটবলের অ্যাথলেটিসিজম বা শারীরিক শক্তির যুগে রবার্টসন ছিলেন কিছুটা ব্যতিক্রম। তিনি হয়তো দ্রুততম ছিলেন না, কিন্তু তাঁর ছিল অবিশ্বাস্য ড্রিবলিং দক্ষতা এবং ফুটবলীয় প্রজ্ঞা। চাপের মুখেও বলের ওপর তাঁর নিয়ন্ত্রণ এবং প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে মুহূর্তের মধ্যে চিরে ফেলার ক্ষমতা তাঁকে বিশ্বের অন্যতম সেরা উইঙ্গারে পরিণত করেছিল। স্কটল্যান্ড জাতীয় দলের হয়েও তিনি ছিলেন সমান উজ্জ্বল, যার প্রমাণ ১৯৮২ বিশ্বকাপে তাঁর অবিস্মরণীয় গোল।
অশ্রুসিক্ত বিদায় নটিংহাম ফরেস্টের প্রতিটি সমর্থকের কাছে রবার্টসন ছিলেন এক জীবন্ত মিথ। তাঁর মৃত্যুতে ক্লাবের পক্ষ থেকে দেওয়া শোকবার্তায় বলা হয়েছে, “জন আমাদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর পায়ের জাদুই আমাদের সাধারণ থেকে অসাধুারণে পরিণত করেছিল।”
আজ সিটি গ্রাউন্ডের ট্রফি কেবিনেটে সাজানো রুপোলি ট্রফিগুলো হয়তো একটু বেশিই ম্লান দেখাচ্ছে। কারণ, যে কারিগর এই সাফল্যগুলো এনে দিয়েছিলেন, তিনি আজ না ফেরার দেশে। ফুটবল ইতিহাসে অনেক রথি-মহারথি আসবেন, কিন্তু নটিংহামের কর্দমাক্ত মাঠে সেই অবিন্যস্ত চুলের স্কটিশ জাদুকরের মতো করে কেউ আর শিল্প আঁকবেন না।
বিদায়, ফুটবলের পিকাসো।
-এম. এইচ. মামুন










