দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণে দান সদকা

প্রত্যেক প্রাণীই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে। এই অমোঘ সত্যকে লঙ্ঘন করার ক্ষমতা মানুষের নেই। ধনী-গরীব, রাজা-বাদশাহ, ছোট-বড় সবার জীবনেই মৃত্যু যেকোন মুহূর্তে চলে আসতে পারে। তার ভয়ংকর থাবায় মিটে যাবে জীবনের স্বাদ। দপ করে নিভে যাবে মানুষের প্রাণ প্রদীপ। নশ্বর পৃথিবীর মায়া ছিন্ন করে চলে যেতে হবে অন্তহীন পরকালের পথে। যেখানে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-প্রিয়জন থেকে মানুষ হবে সম্পূর্ণ একা। পৃথিবীতে ধন-দৌলত, বিত্ত-বৈভব, সুনাম-সুখ্যাতির অধিপতি থাকলেও পরকালে হ’তে হবে নিঃস্ব ও রিক্ত। পৃথিবীর মায়া মরীচিকায় যারা দুনিয়াকে সর্বস্ব জ্ঞান করবে, পরকালে শূন্য খাতা হাতে পেয়ে তাদের সম্বিত ফিরবে। কিন্তু তখন কেবল আফসোস করা ছাড়া কিছুই করার থাকবে না। সেকারণ প্রত্যেক আদম সন্তানকে ইহজীবন সাঙ্গ হওয়ার আগেই পরকালীন পাথেয় সঞ্চয় করা আবশ্যক। যে পাথেয় তাকে জাহান্নামের অগ্নিগহবর থেকে বাঁচাবে।

দান ও সদকা মূলত একই জিনিস, যেখানে সদকা আরবি শব্দ এবং বাংলাতে দান, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য বিনিময় আশা না করে বৈধ সম্পদ থেকে ব্যয় করাকে বোঝায়; এটি দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ আনে, সম্পদ বৃদ্ধি করে, বিপদ দূর করে এবং অনেক ফজিলত লাভ করা যায়, এমনকি পরিবারের জন্য ব্যয়ও সদকা হিসেবে গণ্য হয়।

ছাদাক্বা এমনই এক ইবাদত যার মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য হাছিল হয় এবং জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা একটি খেজুরের টুকরা দান করে হ’লেও জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচো’।

আল্লাহ বলেন, ‘আর যারা ধন-সম্পদ ব্যয় করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ও ছওয়াব লাভের দৃঢ় বিশ্বাসের সাথে, তাদের উদাহরণ সমভূমির ঐ বাগিচার মত, যেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হ’লে দ্বিগুণ শস্য উৎপাদিত হয়। আর প্রবল বৃষ্টি না হ’লে হাল্কা বৃষ্টিই যথেষ্ট হয়। বস্ত্তত তোমরা যা কিছু কর, আল্লাহ সবই দেখেন’

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘ছাদাক্বা গোনাহকে নিভিয়ে দেয়, যেমন পানি আগুনকে নিভিয়ে দেয়’। তিনি বলেন,  ‘নিশ্চয় ছাদাক্বা কবরের উত্তাপ নিভিয়ে দেয় এবং ক্বিয়ামতের দিন মুমিন তার ছাদাক্বার ছায়াতলে আশ্রয় পাবে… মানুষের মধ্যে বিচারকার্য শেষ না হওয়া পর্যন্ত’।

ছাদাক্বার নেকী অপরিসীম  রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে ব্যয় করে, তার জন্য সাতশ’ গুণ নেকী লেখা হয়’। তিনি বলেন, ‘হে আদম সন্তান! প্রয়োজনের অতিরিক্ত যে সম্পদ তোমার কাছে আছে তা খরচ করা তোমার জন্য (দুনিয়া ও আখিরাতে) কল্যাণকর। আর তা খরচ না করা হবে অকল্যাণকর। প্রয়োজনীয় পরিমাণ ধন-সম্পদ (জমা করায়) দোষ নেই। তোমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত ধন-সম্পদ ব্যয়ের কাজ নিজ পরিবার-পরিজন থেকে শুরু করো’

হাদীছে কুদসীতে রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি দান কর, তোমাকেও দান করা হবে’।

 রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) আরও বলেন, ‘সৎকর্ম সমূহ মন্দ পরিণতি থেকে রক্ষা করে। গোপন ছাদাক্বা আল্লাহর ক্রোধ নিভিয়ে দেয়। আর আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করলে বয়স বৃদ্ধি পায়’।

ছাদাক্বা রোগ-ব্যধি দূর করে  রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘তোমরা তোমাদের পীড়িতদের চিকিৎসা কর ছাদাক্বার মাধ্যমে, তোমরা তোমাদের সম্পদকে সুরক্ষিত কর যাকাত দানের মাধ্যমে এবং বালা-মুছীবত থেকে বাঁচার চেষ্টা কর দো‘আর মাধ্যমে’। বস্ত্তত আল্লাহর সন্তুষ্টি হাছিল ও তাঁর ক্রোধ থেকে বাঁচার মাধ্যম হ’ল ছাদাক্বা।

দান-ছাদাক্বা একটি মহৎ ইবাদত। কিন্তু শয়তানী প্ররোচনায় বহু মানুষ লোক দেখানো দান-ছাদাক্বা করে থাকে। আর কোন ব্যক্তি যে আমলই করুক না কেন, তার উদ্দেশ্য হ’তে হবে কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। কেননা আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্য ব্যতীত কোন ইবাদতের ছওয়াব লাভ করা যাবে না। আল্লাহ বলেন,  ‘আর যারা লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে এবং আল্লাহর প্রতি ও বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস রাখে না। বস্ত্তত শয়তান যার সঙ্গী হয়েছে, সে নিকৃষ্ট সঙ্গীই বটে!’ (নিসামাদানী /৩৮)

রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন (রিয়াকারদের মধ্যে) প্রথমে যে ব্যক্তির বিচার হবে, সে হবে শহীদ। …দ্বিতীয় ব্যক্তি হ’ল আলেম। …আর তৃতীয় ব্যক্তি হবে সম্পদশালী ব্যক্তি। আল্লাহ যার রিযিক প্রশস্ত করে দিয়েছিলেন এবং তাকে দান করেছিলেন সব ধরনের সম্পদ। তাকে আল্লাহর দরবারে হাযির করা হবে। অতঃপর আল্লাহ তাকে দেওয়া তাঁর নে‘মত সমূহের কথা স্মরণ করিয়ে দিবেন এবং সেও তা স্বীকার করবে। অতঃপর তিনি তাকে বলবেন, তুমি এসবের বিনিময়ে কি করেছ? সে বলবে, তুমি খুশী হবে এমন কোন রাস্তায় দান করতে আমি বাকী রাখিনি। তখন আল্লাহ বলবেন, তুমি মিথ্যা বলছ। বরং তুমি এ উদ্দেশ্যে দান করেছিলে যাতে বলা হয় যে, তুমি একজন ‘দানবীর’। আর তা বলাও হয়েছে। অতঃপর তার বিষয়ে আদেশ দেওয়া হবে এবং তাকে উপুড় করে টানতে টানতে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে’।

দুনিয়াবী কোন প্রতিদানের আশা ছাড়াই নিঃশর্তভাবে দান করতে হয়। দান করে খোটা দেয়া একটি গর্হিত কাজ। খোটা তারাই দেয় যারা দুনিয়াবী কল্যাণ কামনা করে। যারা নিঃশর্তভাবে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পরকালীন মুক্তির আশায় দান করে তারা কখনো খোটা দেয়ার মত অন্যায় আচরণ করে না।

আল্লাহ বলেন, ‘হে বিশ্বাসীগণ! তোমরা খোটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমাদের দানগুলিকে বিনষ্ট করো না। সেই ব্যক্তির মত, যে তার ধন-সম্পদ ব্যয় করে লোক দেখানোর জন্য এবং সে আল্লাহ ও আখেরাতে বিশ্বাস করে না। ঐ ব্যক্তির দৃষ্টান্ত একটি মসৃণ প্রস্তরখন্ডের মত, যার উপরে কিছু মাটি জমে ছিল। অতঃপর সেখানে প্রবল বৃষ্টিপাত হ’ল ও তাকে ধুয়ে ছাফ করে রেখে গেল। এভাবে তারা যা কিছু উপার্জন করে, সেখান থেকে কোনই সুফল তারা পায় না। বস্ত্তত আল্লাহ অবিশ্বাসী সম্প্রদায়কে সুপথ প্রদর্শন করেন না’ (বাক্বারাহমাদানী

দান-সদকা কেবল একটি আর্থিক কাজ নয়, বরং এটি ঈমানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা দাতা ও গ্রহীতা উভয়ের জীবনে বরকত ও কল্যাণ বয়ে আনে, যেমনটি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (সা.) শিক্ষা দিয়েছেন

ছাদাক্বা ধনী-গরীবের সামাজিক ভারসাম্য রক্ষার মাধ্যম। এতে সমাজে সম্পদের প্রবাহ সচল থাকে এবং ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ে উপকৃত হয়। সবচেয়ে বড় কথা হ’ল, পরকালের চিরস্থায়ী জীবনে ছাদাক্বার সঞ্চয় চূড়ান্ত মুক্তির জন্য বড় ভূমিকা পালন করবে। সেকারণে সকলের ছাদাক্বার হাত দীর্ঘ হওয়া উচিত। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন- আমীন!

মামুন