তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন

প্রায় দেড় যুগের নির্বাসিত জীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে দেশে ফিরছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২৫ ডিসেম্বর (বৃহস্পতিবার) তিনি দীর্ঘ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর পর বাংলাদেশের মাটিতে পা রাখছেন। সব ঠিক থাকলে আগামীকাল বেলা ১১টা ৪৫ মিনিটে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন তিনি। তার এই প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। দীর্ঘ সময় পর তার সরাসরি উপস্থিতিকে বিএনপি যেমন দেখছে নতুন উদ্দীপনা ও সাংগঠনিক শক্তির উৎস হিসেবে, তেমনি রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও একে জাতীয় রাজনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করছেন।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ বিমানযোগে লন্ডন থেকে আসার পথে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে।

গত মঙ্গলবার (১৬ ডিসেম্বর) লন্ডনে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তারেক রহমান নিজেই দেশে ফেরার চূড়ান্ত তারিখ ঘোষণা করেছিলেন। লন্ডনে অবস্থানরত দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, “আজকের দিনটি দুটি কারণে বিশেষ। প্রথমত, আজ ১৬ ডিসেম্বর—আমাদের মহান বিজয় দিবস। দ্বিতীয়ত, দীর্ঘ প্রায় ১৭ থেকে ১৮ বছর আমি আপনাদের সঙ্গে যুক্তরাজ্যে ছিলাম; কিন্তু মহান আল্লাহর ইচ্ছায় আগামী ২৫ তারিখে আমি দেশে ফিরে যাচ্ছি।” তার এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা ও জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটে।

তারেক রহমানের দেশে প্রত্যাবর্তনের তারিখ নির্দিষ্ট হওয়ার পর থেকেই সারা দেশের বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। তবে শেষ সময়ে এর মাত্রা আরও বেড়েছে। নেতাকে বরণ করতে দুই-একদিন আগেই সারা দেশ থেকে ঢাকায় আসা শুরু করেছেন নেতাকর্মীরা।

তারেক রহমানকে বরণ করতে দলের পক্ষ থেকে সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। রাজধানীর কুড়িল বিশ্বরোড মোড় থেকে পূর্বাচলমুখী সড়কের উত্তর অংশে দক্ষিণমুখী করে বাঁশ ও কাঠ দিয়ে তৈরি হচ্ছে ৪৮ ফুট বাই ৩৬ ফুটের বিশাল মঞ্চ। এরই মধ্যে মঞ্চের মূল কাঠামো তৈরির কাজ শেষ পর্যায়ে। বিমানবন্দর থেকে ৩০০ ফিট ও কাঞ্চন ব্রিজ পর্যন্ত থাকবে ৯০০ মাইক।

এ উপলক্ষে সারা দেশেই নান্দনিক ব্যানার-ফেস্টুন করা হয়েছে। সংবর্ধনাস্থলের আশপাশে বিরাজ করছে উৎসবের আমেজ। নেতাকে বরণের মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষা করছেন তার অনুসারীরা। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা আশা করছেন সংবর্ধনা অনুষ্ঠান বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

সারা দেশের, মহানগর, জেলা ও উপজেলা শাখাসহ তৃণমূল পর্যায় থেকেই আসছেন নেতাকর্মীরা। অনুষ্ঠানে বিএনপির শীর্ষ নেতারা ছাড়াও যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলের নেতাকর্মীদেরও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।

নির্বাসনের দীর্ঘ অধ্যায়

ওয়ান–ইলেভেন সরকারের সময় চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যাওয়ার পর থেকেই তারেক রহমান সেখানেই অবস্থান করছিলেন। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি দেশের রাজনীতিতে শারীরিকভাবে উপস্থিত না থাকলেও দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছিলেন। ভার্চুয়ালি তিনি বিএনপির সাংগঠনিক কার্যক্রম, রাজনৈতিক কর্মসূচি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তে দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। তবুও দীর্ঘদিন ধরে দলের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের মধ্যে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল—তিনি কবে সরাসরি দেশে ফিরবেন।

১৬ ডিসেম্বরের ঘোষণার মধ্য দিয়ে সেই অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। ঘোষণার পরপরই দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা যায় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

/১১ তার সাথে কী ঘটেছিল ?

গ্রেপ্তার বিচার

২০০৭ সালের ১/১১–এর পরে, সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসে এবং অনেক রাজনৈতিক নেতা–সহ তারেক রহমানকেও গ্রেপ্তার করা হয়। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থপাচারসহ বিভিন্ন মামলা হয়। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ পরবর্তীতে ব্যাপক বিতর্ক হয়।

চিকিৎসা বিদেশ যাত্রা

২০০৮ সালে তারেক রহমানের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ায় আদালতের নির্দেশে তিনি চিকিৎসার জন্য লন্ডনে যান। সেদিন থেকেই তিনি আর বাংলাদেশে ফিরেননি এবং দীর্ঘসময় যুক্তরাজ্যে অবস্থান করছেন।

আইনি মামলা নির্যাতনের অভিযোগ

তারেক রহমান বিভিন্ন মামলার মুখে পড়েন, যাদের মধ্যে কিছু মামলা পরে হাইকোর্ট বা আদালত দ্বারা বাদ দেওয়া বা খারিজ করা হয়। ২০০৭–২০০৮ সময়ে দণ্ড ও মামলাগুলো বিতর্কিত বলে অনেক পক্ষে মনে করেন।

কিছু প্রতিবেদন অভিযোগ করে তিনি রিম্যান্ডে অবস্থানে নির্যাতন ও অসহ্য চিকিৎসা অবহেলার শিকার হন, যার ফলে তার শারীরিক সমস্যা সৃষ্টি হয়েছিল। এই অংশের কিছু বিবরণ বিভিন্ন সংবাদ বা সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে, যদিও বিভিন্ন পক্ষই বিষয়টি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে।

প্রবাস জীবন রাজনীতি

২০০৮–এর পর থেকে তিনি লন্ডনে দীর্ঘসময় অবস্থান করছেন, সেখান থেকেই বিএনপি–র কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন এবং দেশের রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন।

রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোড়ন

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে দেশের রাজনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হয়েছে। তার আগমন উপলক্ষে ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন জেলায় বিএনপির পক্ষ থেকে আনন্দ র‍্যালি অনুষ্ঠিত হয়েছে। দলীয় সূত্র জানায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সাম্প্রতিক অসুস্থতা এবং ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রেক্ষাপটেই তারেক রহমানের দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়।

আবাসন নিরাপত্তা প্রস্তুতি

দলীয় সূত্র জানিয়েছে, দেশে ফিরে তারেক রহমান গুলশানের ‘ফিরোজা’ অথবা পার্শ্ববর্তী একটি বাসভবনে অবস্থান করবেন। গুলশান অ্যাভিনিউয়ের নির্ধারিত বাসভবনটি বর্তমানে মেরামতের কাজ চলছে।

তার প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে রাজধানীজুড়ে নেওয়া হয়েছে নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তার নিরাপত্তায় প্রায় ২ হাজার পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন থাকবে। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে গুলশান পর্যন্ত পুরো পথজুড়ে থাকবে বিশেষ নিরাপত্তা বলয়। পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকের সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থা এবং বিএনপির নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনী ‘চেয়ারপারসন সিকিউরিটি ফোর্স (সিএসএফ)’ সমন্বিতভাবে দায়িত্ব পালন করবে।

বিমানে কেবিন ক্র প্রত্যাহার

নিরাপত্তা বিবেচনায় তারেক রহমানের লন্ডন–ঢাকা রুটের বিমানে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের দুই কেবিন ক্রকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। গোয়েন্দা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার তথ্য উঠে আসায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এর আগেও চলতি বছরের ২ মে খালেদা জিয়ার ফ্লাইটে একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।

প্রত্যাবর্তনের তাৎপর্য

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন পর তারেক রহমানের সরাসরি উপস্থিতি বিএনপির জন্য নতুন উদ্দীপনা ও কৌশলগত শক্তি যোগাবে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের আগে তার এই প্রত্যাবর্তন দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহাসিক অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

প্রত্যাবর্তন নিয়ে কেন্দ্রিয় নেতাদের বক্তব্য :

তারেক রহমানের আগমন নিয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, তারেক রহমান বিমানবন্দরে থেকে সরাসরি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মায়ের কাছে যেতে চান, যেতে চান পিতা ও ভাইয়ের কবর জিয়ারত করতে। তিনি এমন একটি দিন তার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের তারিখ নির্ধারণ করেছেন, যেটি টানা ৩ দিন সরকারি ছুটির মধ্যে পড়ে।

তিনি বলেন, তারেক রহমান এমন কোনো কর্মসূচিকে সমর্থন করেন না, যা জনদুর্ভোগের সৃষ্টি করে। তিনি এরইমধ্যে লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে নেতাকর্মীদের উপস্থিত হতে নিষেধ করেছেন।

তারেক রহমানের নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে আমরা রাজধানীর কেন্দ্রস্থল সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও মানিকমিয়া অ্যাভিনিউতে কোনো কর্মসূচি রাখিনি বলে উল্লেখ করেন সালাহউদ্দিন। তিনি বলেন, রাজধানীর একপাশে প্রশস্ত ৩৬ জুলাই মহাসড়কের সার্ভিস লেনের একপাশে আমরা স্থান নির্ধারণ করেছি। সেখানে শুধু দেশবাসীর প্রতি তার (তারেক রহমান) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া ও দেশবাসীর কল্যাণ কামনা করা হবে। সেই আয়োজনে তারেক রহমান ছাড়া দ্বিতীয় কোনো বক্তা থাকছেন না।

বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভীর সই করা এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আগামীকাল বৃহস্পতিবার (২৫ ডিসেম্বর) বাংলাদেশ বিমানযোগে লন্ডন থেকে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করবেন। তাকে বহনকারী বিমান লন্ডন থেকে আসার পথে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর হয়ে ঢাকা হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করবে। এমন অবস্থায় বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অভ্যর্থনা জানাতে সমবেত ও ভিড় না করার জন্য দলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, তারেক রহমান যেদিন বাংলাদেশে পা দেবেন, সেদিন যেন সারা বাংলাদেশ কেঁপে ওঠে। সেদিন গোটা বাংলাদেশের চেহারা বদলে দিতে চায় বিএনপি।

মির্জা ফখরুল বলেন, অনেক বাধা–বিপত্তি আসবে। বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারণা চলছে, সেটি চলতে থাকবে। সবকিছু কাটিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হবে। বিএনপি কোনো দিনই পরাজিত হয়নি, পরাজিত হবে না। বিএনপি এ দেশের জনগণের দল, মুক্তিযুদ্ধের দল। বিএনপিকে সাফল্য দেবে ইস্পাতদৃঢ় ঐক্য ও জাতীয়তাবাদী দর্শন, অন্য কিছু সফলতা দেবে না।

আবদুল মোমিন/