আক্রান্ত গণমাধ্যম, অশান্ত ঢাকা

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা আবারো রাজনৈতিক উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে। ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম সংগঠক ছাত্রনেতা শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যু দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে হঠাৎ বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। ১২ ডিসেম্বর নির্বাচনী প্রচারণার সময় পুরানা পল্টনে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর বহুদিন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে থাকার পর ১৮ ডিসেম্বর রাতে সিঙ্গাপুরে তিনি মারা যান। তার মৃত্যুর সংবাদ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই শাহবাগসহ বিভিন্ন জায়গায় হাজারো ছাত্র ও সাধারণ মানুষ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। এই আন্দোলন দ্রুতই আন্দোলনের স্থান, কৌশল, স্লোগান ও প্রতীকে বিকশিত হয় এবং রাতভর শাহবাগ মোড় অবরুদ্ধ থাকে। তরুণেরা মশাল মিছিল বের করে এবং “হাদি হাদি”, “দিল্লির দালাল হুঁশিয়ার”, “আজাদী” ইত্যাদি স্লোগানে উচ্চকিত রাজধানীকে রীতিমতো প্রতীকী অধিকার প্রতিষ্ঠার জায়গায় পরিণত করে। আন্দোলন পরের দিন সকালেও অব্যাহত থাকে এবং ঘোষণা আসে দুপুর ৩টায় আধিপত্যবাদবিরোধী সমাবেশের।

শরীফ ওসমান হাদিকে শুধু একজন ব্যক্তি বা ছাত্রনেতা হিসেবে দেখা হলে আন্দোলনের ব্যাপ্তি উপলব্ধি করা যাবে না। হাদি দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি প্রভাব, বিশেষত ভারতীয় আধিপত্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার অবস্থানের প্রতীক ছিলেন। জুলাই আন্দোলনে তার বক্তৃতা, মাঠ পর্যায়ে সংগঠক অবদান এবং পরবর্তী সময়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা তাকে ছাত্রসমাজ ও তরুণ নাগরিকদের মাঝে প্রতীকে পরিণত করে। তাই তাকে গুলিবিদ্ধ করার ঘটনা, চিকিৎসার ব্যর্থতা এবং মৃত্যু—সবকিছু মিলিয়ে জনগণের রাজনৈতিক ক্ষোভ ও অবিশ্বাসের জটিল মানসিক কাঠামো নতুনভাবে বিস্ফোরিত হয়েছে। সামাজিক আন্দোলনের তত্ত্ব অনুযায়ী grievance accumulation (ক্ষোভ সঞ্চয়) ও trigger event (স্ফুলিঙ্গ) একসাথে ঘটলে collective uprising (সমষ্টিগত বিদ্রোহ)-এর সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি দেখা দেয়। হাদির মৃত্যু সেই ট্রিগার। কয়েক বছর ধরে বৈষম্য, বেকারত্ব, রাজনৈতিক অবিশ্বাস, ক্রমবর্ধমান বিদেশি প্রভাবের অনুভূতি এবং গণতান্ত্রিক সংকট মানুষের মাঝে জমা হচ্ছিল। তাই হাদির মৃত্যুর পরের প্রতিক্রিয়া শুধু ব্যক্তির মৃত্যুতে শোক নয়—বরং গভীর প্রতীকি, রাজনৈতিক ও জাতীয়তাবাদী প্রতিক্রিয়ার প্রতিচ্ছবি।

বিক্ষোভের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক ছিল যে আন্দোলন শুধু ছাত্রদের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি; বরং বিভিন্ন বয়স, পেশা ও শ্রেণির সাধারণ মানুষও যুক্ত হয়। কেউ ছিলেন রিকশাচালক, কেউ ছিলেন বেকার যুবক, কেউ চাকরিজীবী—সবাই একই স্লোগানে যুক্ত হন। এটি নির্দেশ করে যে আন্দোলনটি একটি বৃহত্তর সামাজিক ক্ষোভের বাহন হয়ে উঠছে। বিশেষত অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব ও অভাবনীয় ব্যয়বৃদ্ধির ফলে নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে যে হতাশা জমে উঠেছিল, তার মুখ পাওয়া গেছে এই আন্দোলনে। তাই আন্দোলনের সামাজিক চরিত্র বহুমাত্রিক। একইসঙ্গে বিদেশি আধিপত্যের অভিযোগ ও হস্তক্ষেপের আশঙ্কা বাংলাদেশের জনগণের রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয়। ভারতের রাজনৈতিক ভূমিকা, বাণিজ্যকেন্দ্রিক চাপ, সীমান্তে হত্যা, পানি-বণ্টন সমস্যা ইত্যাদির কারণে দেশে ভারতের প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সন্দেহ ও ক্ষোভ রয়েছে। আন্দোলনের স্লোগানে ভারতের সরাসরি সমালোচনা এ ক্ষোভকে উন্মোচন করেছে।

গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় যুক্ত হয় গণমাধ্যমে হামলা। কারওয়ান বাজারে দেশের শীর্ষ জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার ভবনে হামলা ও অগ্নিসংযোগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিন ধরে দেশের মূলধারার সংবাদমাধ্যম নিয়ে জনগণের মধ্যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। অনেকে মনে করেন সংবাদমাধ্যম রাষ্ট্র, ক্ষমতাসীন দল ও বিদেশি শক্তির স্বার্থে কাজ করে, সত্য লুকায় বা বিকৃত করে। তাই হামলাকারীরা মিডিয়াকে প্রতীকি শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা—যা গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি—আজ নিউজরুম, সাংবাদিক এবং অফিস ভবনের নিরাপত্তা সংকটের মুখে। এই হামলা শুধু গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে নয় বরং দেশের রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও নাগরিক কাঠামোর ওপর আঘাত। রাষ্ট্র, মিডিয়া ও জনতার মধ্যে যে বিশ্বাসের ফাটল তৈরি হয়েছিল, তা এখন স্পষ্ট সহিংসতায় গড়িয়ে পড়ছে।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। রাতভর বিক্ষোভ ঘটে, ভবন ভাঙচুর হয়, আগুন জ্বলে, অথচ নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিক্রিয়া অনেক স্থানে দেরিতে বা সীমিত পর্যায়ে দেখা গেছে। এটি কি প্রশাসনিক ব্যর্থতা? না কি কৌশলগত নীরবতা? কেউ কেউ মনে করেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিধ্বংসী শক্তি হিসেবে নয় বরং পরিস্থিতি উত্তপ্ত না করার লক্ষ্যেই ‘ন্যূনতম হস্তক্ষেপ’ করেছে। আবার অন্য বিশ্লেষকরা বলেন, প্রশাসন ভুল অনুমান করেছে কিংবা সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা কিংবা ‘নির্দেশের অপেক্ষা’ দুইটিই ব্যাখ্যা হতে পারে। তবে যাই হোক, ঘটনাগুলো প্রমাণ করে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামো রাজনৈতিক সংকটে দ্রুত প্রতিক্রিয়া দেখাতে সক্ষম নয়।

রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হলেও তা যথেষ্ট মনে করেন না আন্দোলনকারীরা। তারা দ্রুত বিচার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার পদত্যাগ এবং বিদেশি প্রভাব থেকে রাষ্ট্রীয় নীতি স্বাধীন করার দাবি জানিয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলোও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। বিরোধী দলগুলো অভিযোগ করেছে সরকার হামলাকারীদের সুরক্ষা দিচ্ছে, তারা দ্রুত বিচার চায়। সরকার বরং তদন্ত ও শান্তি বজায় রাখার কথা বলেছে। তবে এসব বিবৃতি মানুষের সমস্যার গভীরতায় পৌঁছাতে পারেনি, বরং সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। ফলে রাষ্ট্রের প্রতি অবিশ্বাস আরও গভীর।

অর্থনৈতিক প্রভাবও তাৎপর্যপূর্ণ। শাহবাগ অবরোধের ফলে ঢাকার প্রধান সড়কগুলো অচল হয়ে গেছে। হাসপাতাল, অফিস, জনসেবা—সব বিঘ্নিত। ছোট ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে পোশাক শ্রমিক পর্যন্ত কাজে যেতে পারেননি অনেকে। বেকারত্ব ও আর্থিক অনিশ্চয়তার সময় এধরনের বিঘ্ন মানুষের হতাশা বাড়াতে পারে। আবার একইসঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে সাংবিধানিক, রাষ্ট্রিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও এর প্রভাব পড়বে।

অশান্ত ঢাকা এখন গভীর রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মিলিটারি, প্রশাসন, গণমাধ্যম, বিচারব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক দল—সব প্রতিষ্ঠানকে জনতার সন্দেহের নজরে দেখা হচ্ছে। আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো—যেখানে রাজনৈতিক আস্থা ভেঙে পড়ে, সেখানে গণমাধ্যমকেও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। কারণ মিডিয়াই সেই প্রতিষ্ঠান যা সত্য, অভিযোগ, বিচার, তত্ত্ব ও বিশ্লেষণ বহন করে। তাই গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণকে সামাজিক আন্দোলনের “institutional frustration spill-over” বলা যায়।

কিন্তু প্রশ্ন উঠছে—গণমাধ্যম কি সত্যিই একতরফা দোষী? অনেক গবেষক মনে করেন, রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো দুর্বল হলে, গণমাধ্যমও দুর্বল হয়; ক্ষমতার চাপ, ব্যবসায়িক চাপ এবং রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান পেশাগত নীতিমালা থেকে বিচ্যুত হয়। ফলে জনগণের বিশ্বাস কমে যায়। আর জনগণ যখন দেখেন রাষ্ট্র ও মিডিয়া একই ব্লকে, তখন গণমাধ্যম হয়ে ওঠে প্রতীকী শত্রু।

সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বাংলাদেশের রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোয় দীর্ঘদিন ধরে যে আস্থা-সংকট চলছিল, তারই বহিঃপ্রকাশ এখন শাহবাগের বিক্ষোভে। বিদেশি প্রভাব, অর্থনৈতিক সংকট, গণতন্ত্রের সীমাবদ্ধতা, আইনের শাসন দুর্বলতা, বিচার বিলম্ব, দুর্নীতি—এসব বিষয় বহুদিন ধরে জমে ছিল। তাই হাদির মৃত্যু সেই চাপা ক্ষোভকে ‘আবেগের আগুনে’ পরিণত করেছে। মানুষ শুধু হত্যার বিচার চায় না—তারা একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র চায়।

এই পরিস্থিতির সমাধান রাজনৈতিক দমন নয়। ইতিহাস বলে—দমনকৌশল সাময়িক শান্তি ফিরিয়ে আনলেও দীর্ঘমেয়াদে মানুষের ক্ষোভ আরও বিস্ফোরক রূপ নেয়। পুলিশের কড়া পদক্ষেপ, ইন্টারনেট সীমিত করা, মিডিয়া ব্লক করা এবং ভিডিও মুছতে বলার মতো পদক্ষেপ বিপজ্জনক বার্তা পাঠায়—যে রাষ্ট্র সত্য ভয় পায়। এতে আন্দোলনের নৈতিক বৈধতাও বাড়ে।

ভবিষ্যতে রাষ্ট্র, গণমাধ্যম ও নাগরিকদের সামনে কঠিন পথ অপেক্ষা করছে। যদি রাষ্ট্র বিচার, স্বচ্ছতা, স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত না করে, তবে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হতে পারে। কারণ আন্দোলনের চরিত্র এখন একক আর্থ-সামাজিক অসন্তুষ্টির বহিঃপ্রকাশ নয়—বরং জাতীয় স্বায়ত্তশাসন, বৈদেশিক প্রভাব প্রতিরোধ, সন্তোষজনক প্রতিনিধিত্ব ও ন্যায্য রাষ্ট্র কাঠামোর দাবি।

অশান্ত ঢাকার রাস্তা আজ শুধু বিক্ষোভ নয়; এটি রাষ্ট্র-নাগরিক সম্পর্ক এবং গণমাধ্যমের বিশ্বাস-সংকটের প্রতীক। গণতন্ত্র তার দৃশ্যমান কাঠামো নয়, বরং বিশ্বাসের ওপর টিকে থাকে। আর আজ সেই বিশ্বাসই ভেঙে পড়ছে। তাই গণতন্ত্র রক্ষার প্রথম শর্ত হচ্ছে সত্য, জবাবদিহি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত, বিচার নিশ্চিত করা, জনগণের উদ্বেগকে রাজনৈতিক সুবিধাবাদ হিসেবে না দেখে বাস্তব ও গভীর সংকট হিসেবে বিবেচনা করা। গণমাধ্যমেরও উচিত—মালিকানাভিত্তিক এজেন্ডা বাদ দিয়ে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার চর্চা ও জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা।

আজকের ঢাকা ইতিহাসের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। প্রজন্ম-পরিবর্তন, রাজনৈতিক জটিলতা ও আন্তর্জাতিক প্রভাবের প্রক্সি খেলায় জর্জরিত বাংলাদেশ হয় সমঝোতার পথে এগোবে, নয়তো সংঘর্ষের নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এই অস্থিরতা কতদিন চলবে তা কেউ জানে না, তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়—অশান্ত ঢাকা ও আক্রান্ত গণমাধ্যমের সংকট বাংলাদেশ রাষ্ট্র ও সমাজের ভবিষ্যত দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করবে।