ফিতনার ভয়াবহতায় মুসলমানদের করণীয়

আধুনিক বিশ্বে চলমান সংঘাত, যুদ্ধ, এবং মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টিকেও ফিতনা বলা হয়। সংক্ষেপে, ফিতনা হলো এমন একটি অবস্থা যা মানুষকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে, সমাজে অশান্তি ও বিভেদ সৃষ্টি করে এবং ঈমান দুর্বল করে দেয়।

পবিত্র কুরআনের আলোকে ফিতনা

সাধারণ মানুষ ফিতনা বলতে মারামারি, হানাহানি, হত্যা ইত্যাদি বুঝে থাকেন। তাদের উক্ত ধারণাটি পুরোপুরি সঠিক নয়। বরং ফিতনা একটি ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ। আল্লাহ তাআলা ফিতনার মাধ্যমে তাঁর কৃতজ্ঞ বান্দাদেরকে অকৃতজ্ঞ মানুষ থেকে পৃথক করেন। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন,  ‘তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি তো কেবল পরীক্ষা বিশেষ’। [আত-তাগাবুন: ১৫]
তিনি আরো বলেন,
‘আর কিছু লোক আছে যারা বলে, ‘আমরা আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছি। অতঃপর যখন আল্লাহর ব্যাপারে তাদের কষ্ট দেওয়া হয়, তখন তারা মানুষের নিপীড়ন-পরীক্ষাকে আল্লাহর আযাবের মতো গণ্য করে। আর যদি তোমার রবের পক্ষ থেকে কোনো বিজয় আসে, তখন অবশ্যই তারা বলে, ‘নিশ্চয় আমরা তোমাদের সাথে ছিলাম’। সৃষ্টিকুলের অন্তরসমূহে যা কিছু আছে, আল্লাহ কি তা সম্পর্কে সম্যক অবগত নন?’। [আল-আনকাবূত: ১০]
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, وَالْفِتْنَةُ أَشَدُّ مِنَ الْقَتْلِ ‘আর ফিতনা হত্যার চেয়েও কঠিনতর’। [আল-বাক্বারা: ১৯১]
তিনি আরো বলেন, وَالْفِتْنَةُ أَكْبَرُ مِنَ الْقَتْلِ ‘আর ফিতনা হত্যার চেয়েও বড়’। [আল-বাক্বারা: ২১৭]
তিনি এ প্রসঙ্গে আরো বলেন, وَقَاتِلُوهُمْ حَتّٰى لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلّٰهِ ‘তোমরা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে থাকো, যতক্ষণ না ফিতনা দূরীভূত হয়’। [আল-বাক্বারা: ১৯৩] এই আয়াতে ফিতনা বলতে শিরক বুঝানো হয়েছে।
মহান আল্লাহ আরো বলেছেন, وَاتَّقُوا فِتْنَةً لَا تُصِيبَنَّ الَّذِينَ ظَلَمُوا مِنْكُمْ خَاصَّةً
‘আর তোমরা ভয় করো ফিতনাকে, যা তোমাদের মধ্য থেকে বিশেষভাবে শুধু যালিমদের উপরই আপতিত হবে না’। [আল-আনফাল: ২৫]

কোরআনে মহান আল্লাহ তাঁর প্রিয় বান্দাদের ফিতনার ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, আল্লাহর কাছে ফিতনা হত্যা অপেক্ষা মারাত্মক। (সুরা বাকারা, আয়াত : ২১৭)

হাদীসের আলোকে ফিতনা
আবু হুরায়রা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, ‘অন্ধকার রাতের মতো ফিতনা আসার আগেই তোমরা নেক আমলের প্রতি অগ্রসর হও। সে সময় সকালে একজন মুমিন থাকলে বিকেলে কাফির হয়ে যাবে। বিকেলে মুমিন থাকলে সকালে কাফির হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে’।

হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন, সেই সত্তার শপথ! যার হাতে আমার জীবন, দুনিয়া ধ্বংস হবে না যে পর্যন্ত না মানুষের কাছে এমন এক যুগ আসবে, যখন হত্যাকারী জানবে না যে, কি কারণে সে অন্যকে হত্যা করেছে এবং নিহত লোকও জানবে না যে, কি কারণে তাকে হত্যা করা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করা হলো, কিভাবে এমন অত্যচার হবে? তিনি জবাবে বললেন, সে যুগটা হবে হত্যার যুগ। এরূপ যুগের হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামি হবে। [সহিহ মুসলিম : ৭১৯৬]

মুমিনগণ শত বাধা, জুলুম-নির্যাতন ও আল্লাহর পক্ষ হতে সকল পরীক্ষায় ধৈর্যধারণ করে ঈমানের উপর অটুট থাকে। আর মুনাফিকরা সাময়িক যুলুম-নির্যাতনের ভয়ে দ্বীনের পথ হতে পলায়ন করে এবং তারা ধারণা করে যে, তারা মুক্তি পাবে। পক্ষান্তরে তারা নিজেদের উপর বিপদ ডেকে আনে এবং আল্লাহর নাজাত হতে দূরে সরে যায়। যেমন কোনো মানুষ কয়লার ভয়ে ভীত হয়ে পলায়ন করে আগুনে ঝাঁপ দেয়। বস্তুত দুনিয়ার জুলুম-নির্যাতন, দুঃখ-কষ্ট ক্ষণস্থায়ী আর আখিরাতের শাস্তি অসহনীয় এবং চিরস্থায়ী।

ফিতনা নিজেই এক ভয়ঙ্কর এ শাস্তি
ভূমিকম্প এক ধরনের আযাব ও আল্লাহর পক্ষ থেকে শাস্তি স্বরূপ। বর্তমান সময়ে ভূমিকম্প দিন দিন বেড়েই চলছে। আর ভূমিকম্প হওয়ার ব্যাপারে হাদিসে পাকে এসেছে ফিতনার সময় অধিকতর ভূমিকম্প হয়ে থাকে। যেমন হযরত আবু মুসা রাদিয়াল্লাহু তা’লানহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
أُمَّتِىْ هَذِهِ أُمَّةٌ مَرْحُوْمَةٌ لَيْسَ عَلَيْهَا عَذَابٌ فِى الآخِرَةِ عَذَابُهَا فِى الدُّنْيَا الْفِتَنُ وَالزَّلاَزِلُ وَالْقَتْلُ
‘আমার এ উম্মত দয়াপ্রাপ্ত, পরকালে এদের কোনো শাস্তি হবে না, আর ইহকালে তাদের শাস্তি হলো ফিতনাসমূহ, ভূমিকম্প ও যুদ্ধবিগ্রহ’। [সুনানু আবু দাউদ: ৪২৭৮]
ইবনু ওমর রাদিয়াল্লাহু তা’লানহু থেকে বর্ণিত তিনি বলেন,
أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَامَ عِنْدَ بَابِ حَفْصَةَ رَضِيَ اللهُ عَنهَا فَقَالَ بِيَدِهِ نَحْوَ الْمَشْرِقِ الْفِتْنَةُ هَا هُنَا مِنْ حَيْثُ يَطْلُعُ قَرْنُ الشَّيْطَانِ قَالَهَا مَرَّتَيْنِ أَوْ ثَلاَثًا.
‘একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়া সাল্লাম হাফসা রাদিয়াল্লাহু তা’লানহা এর দরজার নিকট দণ্ডায়মান ছিলেন। এ সময় তিনি তাঁর আঙ্গুল দ্বারা পূর্বদিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ফিতনা এ দিক থেকে আসবে, যেদিক থেকে শয়তানের শিং উদিত হবে। এ কথাটি তিনি দুই বা তিনবার বলেছেন’।
নবীজি সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম পূর্বের দিকে ইঙ্গিত করে ইরাকসহ পুরো প্রাচ্যকে বুঝিয়েছেন। কারণ ইরাক থেকেই খারেজী, শিয়া, মু‘তাযিলা, জাহমিয়া, মাজূসী, মানুবিয়া, মুযদাকিয়াসহ বহু ভ্রান্ত দলের আবির্ভাব ঘটেছে। অপরদিকে চীন ও ভারত থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, কাদিয়ানী, বাহাইয়া ও তাতারদের আবির্ভাব ঘটেছে এবং পরবর্তীতে দাজ্জাল ও ইয়াজূজ-মাজূজের ফিতনার আবির্ভাবও ঘটবে পূর্বদিক হতে।

পূর্বেকার হাদিসের ব্যাখ্যাকাররা আলোচ্য হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখন তো মক্কা শরিফ পাথুরে ভূমি এবং পাহাড়ি এলাকা, তবে ভবিষ্যতে কোনোকালে আল্লাহ এ শহরে নদী এবং খাল-বিল সৃষ্টি করবেন। কিন্তু আজকের সুরঙ্গ পথগুলো দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, কিভাবে মক্কা নগরীর টিলাগুলো বিদীর্ণ করা হয়েছে।

ফিতনার সময় মুসলমানদের করণীয়
এ প্রসঙ্গে একটি হাদীস উল্লেখ করা যায়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘আধার রাতের ন্যায় ফিতনা আসার পূর্বেই তোমরা নেক আমলের দিকে ধাবিত হও। কেননা এমন এক সময় আসবে যে সময় সকালে একজন মুমিন থাকলে সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে। সন্ধ্যায় মুমিন থাকলে সকালে কাফের হয়ে যাবে। দুনিয়ার সামগ্রীর বিনিময়ে সে তার দ্বীন বিক্রি করে দিবে’। [সহিহ মুসলিম: ১১৮]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘তোমরা বলো, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট জাহান্নামের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি, মাসীহ দাজ্জালের সম্মোহিত বিপর্যয় থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং জীবন-মরণের পরীক্ষা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি’। [সহিহ মুসলিম: ৫৯০]

আর পুরস্কারপ্রাপ্ত হলো তারা, যারা আহলে ইলম ও ইলম অনুযায়ী আমলকারী। যেমন তাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন,
‘আর যারা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য করে, তারা তাদের সাথে থাকবে, আল্লাহ যাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন নবী, সিদ্দীক্ব, শহীদ ও সৎকর্মশীলদের মধ্য থেকে। আর সাথী হিসাবে তারা হবে উত্তম’। [আন-নিসা: ৬৯]

মামুন