গুমের ঘটনায় তদন্তে প্রায় ৫০০ জনকে হত্যার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তবে এসব তথ্য এখনো যাচাই–বাছাই ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন।
বুধবার গুম ও হত্যার অভিযোগে সাবেক র্যাব কর্মকর্তা মেজর জেনারেল (অব.) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিলের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধান প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী সাবেক বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে ১৩ বছর আগে গুমের পর হত্যা করা হয়েছে। একই সঙ্গে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে এক শর বেশি মানুষকে গুমের পর হত্যার অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর বাইরে আরও বড় পরিসরে গুমের ঘটনার তদন্তে প্রায় ৫০০ হত্যার তথ্য প্রসিকিউশনের কাছে এসেছে বলে জানান তিনি।
তাজুল ইসলাম বলেন, “এটি কোনো চূড়ান্ত সংখ্যা নয়। তদন্তে আমরা এমন তথ্য পেয়েছি, যা থেকে বোঝা যায়—গুমের পর বহু মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। এসব তথ্য যাচাই করে ধাপে ধাপে মামলা আকারে আদালতে উপস্থাপন করা হবে।”
ইলিয়াস আলী গুমের তথ্য
প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী, বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলীকে ২০১২ সালের এপ্রিলে ঢাকার বনানী এলাকা থেকে তুলে নেওয়া হয়। তদন্তে জানা গেছে, তাঁকে রাস্তা থেকে গুম করা হয় এবং পরবর্তী সময়ে হত্যা করা হয়। তবে হত্যার স্থান ও মরদেহ উদ্ধারের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে অভিযোগ
প্রধান প্রসিকিউটর জানান, তদন্তে উঠে এসেছে—ইলিয়াস আলী গুমসহ একাধিক আলোচিত গুমের ঘটনায় সাবেক র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানের সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া গেছে। তাঁর নির্দেশনা ও প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে এসব ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে অভিযোগ আনা হয়েছে।
এ ছাড়া ২০১৫ সালে বিএনপির তৎকালীন যুগ্ম মহাসচিব সালাহউদ্দিন আহমদকে গুম করে ভারতে পাচার, ২০১৩ সালে তেজগাঁও থানার বিএনপি নেতা সাজিদুল ইসলাম সুমনসহ আটজনকে তুলে নেওয়া এবং ইসলামী ছাত্রশিবির নেতা গোলাম কিবরিয়া মিহিনসহ কয়েকটি গুমের ঘটনার পরিকল্পনাকারী হিসেবেও জিয়াউল আহসানের নাম উঠে এসেছে।
৫০০ হত্যার তথ্য কীভাবে এসেছে
প্রসিকিউশন সূত্র জানায়, ২০০৯ থেকে ২০১৮ সময়কালের গুমের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত চালিয়ে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা, সাক্ষীদের জবানবন্দি এবং বিভিন্ন নথি বিশ্লেষণ করে হত্যার তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে গুমের শিকার ব্যক্তিরা আর ফিরে আসেননি এবং তাঁদের মৃত্যু হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
তবে এসব ঘটনায় এখনো প্রত্যেক ভুক্তভোগীর পরিচয়, ঘটনার স্থান ও সময় নির্দিষ্ট করে চূড়ান্ত করা হয়নি বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
তালিকা প্রকাশে সতর্কতা
প্রধান প্রসিকিউটর জানান, বিচারিক স্বার্থে এখনই ৫০০ হত্যার পূর্ণ তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে না। তিনি বলেন, সাক্ষীদের নিরাপত্তা, প্রমাণ সংরক্ষণ এবং বিচার প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই ধাপে ধাপে তথ্য প্রকাশ করা হবে।
প্রেক্ষাপট
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের গুমের অভিযোগ দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলো বারবার তুলে ধরলেও তখন সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছিল। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতারা গুমের অভিযোগকে ‘নাটক’ বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
গণ–অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করে গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর তদন্ত শুরু করে।
পরবর্তী পদক্ষেপ
ট্রাইব্যুনাল আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ায় মামলার বিচারিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তদন্তে পাওয়া ৫০০ হত্যার তথ্যের ভিত্তিতে পর্যায়ক্রমে আলাদা আলাদা মামলা ও অভিযোগ গঠন করা হতে পারে বলে জানিয়েছে প্রসিকিউশন।









