জাদুঘরের চেয়েও বেশি কিছু ‘জুলাই স্মৃতি জাদুঘর’

জুলাই স্মৃতি জাদুঘর চব্বিশের জুলাইসহ স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনার ষোল বছরের গুম ও খুনের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়েছে। এটি এমন একটা জাদুঘর যা জাতিকে রোজ মনে করিয়ে দেবে মানুষের প্রতিরোধের কথা। কোনো শাসক আবার স্বৈরাচারী হয়ে উঠতে চাইলে এই জাদুঘরই হয়ে দাঁড়াবে একটি মনস্তাত্ত্বিক বাঁধা স্বরূপ।

জুলাই জাদুঘরে ঢুকতেই বিশাল জায়গা জুড়ে রয়েছে একটি কবস্থান, যেখানে জুলাইসহ ষোল বছরে শেখ হাসিনা সরকারের করা খুনের শিকার প্রত্যেক শহীদের একটি করে কবর আছে। কবরের সামনে একটি ফলকে লেখা- “দেশপ্রেমীদের রক্ত খেয়ে বাঁচত যাহার সিংহাসন, সব শহীদের দখলে আজ সেই খুনীটার আবাসন।”

৩৬ জুলাই এ মানুষের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ যে গণভবনে ঘটেছিলো, তার একদম বাস্তবিক কিছু দৃশ্য অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে সেখানে। যেমন, কিছু ভাঙা দেয়াল, কিছু দেয়াল লিখন ইত্যাদি।

জাদুঘরের ভেতরে একটা ঘরে থ্রিডি আয়নাঘরের অনুভূতি পাওয়া যাবে। জুলাই এর সময়কার সরাসরি ভিডিও এবং ডকুমেন্টারিও দেখানো হবে জাদুঘরে।

 

এছাড়াও অভ্যুত্থানের ছবি, বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন, শহীদের রক্তমাখা পোশাক, চিঠিপত্র, গুরুত্বপূর্ণ দলিল, সে সময়কার পত্রিকার কাটিং, অডিও-ভিডিওসহ নানা উপকরণ সংরক্ষণ করা হয়েছে। তৎকালীন অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার দৃশ্যও সেখানে সংরক্ষিত রয়েছে।

অবশেষে বাস্তবায়িত হয়েছে জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের স্বপ্ন। ২০ জানুয়ারি উদ্বোধন হয়েছে জাদুঘরের, ১ ফেব্রুয়ারি উন্মুক্ত হওয়ার কথা জনসাধারণের জন্য। এই গুরুত্বপূর্ণ কাজটি বাস্তবায়ন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত সবাই।

প্রধান উপদেষ্টা ডক্টর মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, “এই জাদুঘর জুলাই শহিদদের রক্ত তাজা থাকতেই করা সম্ভব হয়েছে, এটা গোটা পৃথিবীর এক নজিরবিহীন দৃষ্টান্ত।”

তিনি বলেন, “আমরা চাইনা ভবিষ্যতে কোথাও যেন আর এমন জাদুঘর তৈরির প্রয়োজন হোক। যদি আমাদের জাতি কখনো কোনো কারণে দিশেহারা হয় তবে এই জাদুঘরে পথ খুঁজে পাবে।”

“দেশের প্রতিটি নাগরিকের উচিত হবে এখানে এসে একটি দিন কাটানো, শিক্ষার্থীরা দল বেঁধে এই জাদুঘরে আসবেন। এই জাদুঘরে একটা দিন কাটালে মানুষ জানতে পারবে কী নৃশংসতার মধ্য দিয়ে এ জাতিকে যেতে হয়েছে। এখানে যে আয়নাঘরগুলো তৈরি হয়েছে সেখানে কিছু সময়, কয়েক ঘণ্টা অথবা একটা দিন কেউ যদি থাকতে চায় সে যেন থাকতে পারে।”

তিনি বলেন, আয়নাঘরে বসে পরিদর্শনকারীরা উপলব্ধি করতে পারে কী নৃশংসতার মধ্যে বন্দিরা ছিল!

“এ ধরনের নৃশংস ঘটনা না হওয়ার পক্ষে কীভাবে আমরা সবাই এক থাকতে পারি সেটা মনের মধ্যে আনতে হবে। এই একটা মতে আমরা সবাই এক থাকব যে এই ধরনের নৃশংস দিনগুলোতে এ জাতি আর ফিরে যাবে না”, বলেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, নৃশংস একটা কাণ্ড হচ্ছিল। তরুণরা, ছাত্ররা এটার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে, প্রতিহত করেছে। তাদের কোনো অস্ত্রশস্ত্র ছিল না, কিছু ছিল না। সাধারণ মানুষও যে এমন নির্ভয়ে, সাহসিকতার সঙ্গে অস্ত্রের মুখে দাঁড়াতে পারে, এটাই আমাদের শিক্ষা।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ জাদুঘরের কাজে নিয়োজিত সকলকে ধন্যবাদ জানান প্রধান উপদেষ্টা।

সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “অল্প সময়ে এই জাদুঘরের কাজ এই পর্যায়ে এসেছে এটা একটা রেকর্ড। এটা সম্ভব হয়েছে অনেক ছেলেমেয়ের অক্লান্ত পরিশ্রমে। আট মাস ধরে বিনা পারিশ্রমিকে এখানে কাজ করেছেন অনেকে। তাঁদের সবার প্রতি আমি কৃতজ্ঞতা জানাই।”

“আমাদের আরও বেশ কিছু সেকশনের কাজ আগামী কিছুদিনের মধ্যেই শেষ হবে। এবং নির্বাচনের আগেই সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হবে। জুলাই জাদুঘর ইতিহাসের চিহ্ন বহন করে দাঁড়িয়ে থাকবে। বাংলাদেশের অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের রাজনীতির আকর হয়ে থাকবে এটা। ভবিষ্যত রাজনৈতিক ডিসকোর্স-শিক্ষা-গবেষণায়, শিল্প-সাহিত্য চর্চায়ও এই জাদুঘর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে”, বলেন তিনি।

জাদুঘরের একজন গবেষক জুবায়ের ইবনে কামাল বলেন, “আমি তো শুরুর দিকের পরিকল্পনা থেকে ছিলাম। প্রতিটি ঘর কেমন হবে, কী ধরণের জিনিসকে ফোকাস করা হবে সেগুলো পরিকল্পনা করা হতো মিটিংয়ে। তখন জিনিসটাকে অবিশ্বাস্য মনে হতো। একটা থ্রিডি মডেল স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখলে এটাকে বিশ্বাস করা যেত না। তারপর তো টানা কাজ করতে থাকলাম। কতগুলো নির্ঘুম রাত গণভবনে কাটিয়েছি। তারপর যখন বিডিআরে শহীদ পরিবার, গুম হওয়া ভুক্তভোগী পরিবার আসলো এবং আমাদের কাজগুলো দেখে কাঁদলো তখন বুঝলাম সত্যিই জাদুঘর দাঁড়িয়ে গেছে।”

জাদুঘরের মানবসম্পদ বিষয়ক পরামর্শক কাজী ফাহিম হোসেন বলেন, “বহু মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম ও আত্মত্যাগের ফসল এই মিউজিয়াম তৈরির সাফল্য। কিন্তু আমরা কেউই চাইনি এই দিনটি দেখতে! আমরা চাইনি এত রক্তের বিনিময়ে “গণভবন” নামক অভিশাপটি মুক্ত হয়ে “জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে” রুপান্তরিত হোক। আমাদের আশা এবং প্রতিজ্ঞা থাকা উচিত যে এই জাদুঘরটি যেন ভবিষ্যতেও সব সময় নিরপেক্ষ ভাবে জুলাইে মানুষের শরীর ও হৃদয়ের রক্ত ক্ষরণের সত্য ইতিহাস তুলে ধরে।”

শহীদ মাহমুদুর রহমান সৈকতের বোন সাব্রিনা আফ্রোজ সেবন্তী বলেন, ‘আমরা মনে করি এতো কম সময়ে এই জাদুঘরটা তৈরি হয়েছে, এটা অনেক বড় একটা ব্যপার। এটা একটা বিশ্বমানের জাদুঘর হবে, এবং এই জাদুঘরটা যুগের পর যুগ জুলাইকে ধরে রাখবে। প্রত্যেকটা প্রজন্ম জানবে যে জুলাইতে কী হয়েছিলো।”

“কারণ জুলাই জাদুঘরে সব তাজা জিনিস ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, অনেক কিছু ওখানে আছে যা গণভবনে না হলে বোঝানো যেত না। যেমন, কী পরিমাণে ঘৃণার বহিঃপ্রকাশ মানুষ ঘটিয়েছিলো এখানে। এটা শুধুমাত্র একটা জাদুঘর না, এটা জাদুঘরে চাইতেও অনেক বড় কিছু।”

তিনি এই চমৎকার জাদুঘরটি তৈরির জন্য সংস্কৃতি বিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সারওয়ার ফারুকী এবং জাদুঘরের কিউরেটর তানজিম ওয়াহাবকে বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।

গুমের শিকার ব্যারিস্টার মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান বলেন, “আমরা যতোদিন ফ্যাসিবাদের কুকীর্তি নিয়ে কথা বলতে থাকব, আমাদের পরবর্তী প্রজন্মকে সচেতন করে রাখতে পারব যে ফ্যাসিবাদ ক্ষমতার লোভে কী করেছিলো, ততোদিন আমরা ফ্যাসিবাদের ফিরে আসা রোধ করতে পারব।”

“যখন আমরা ফ্যাসিবাদের ব্যপারে কথা বলতে ভুলে যাব, আমরা এবং পরবর্তী প্রজন্ম ভুলে যাবে যে কীভাবে ফ্যাসিবাদ এসেছিলো এবং কী করেছিলো, তখনই তৈরি হবে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথ”।

তিনি আরো বলেন, “এই জুলাই জাদুঘর এই অতীতকে, এই মানবতা বিরোধী অপরাধগুলোকে স্মরণ রেখে পরবর্তী প্রজন্মকে সচেতন রাখা একটি স্থায়ী সমাধান। এবং আশা করা যায় এটা যদি প্রাণচঞ্চল থাকে, তরুণদের এখানে নিয়মিত নিয়ে আসা যায়, আশা করা যায় আর কখনো ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে পারবে না। এর মাধ্যমে ফ্যাসিবাদের ফিরে আসার চিহ্নগুলো প্রজন্ম চিনতে পারবে। এই জুলাই জাদুঘর হচ্ছে পরবর্তী প্রজন্মের পাঠশালা ফ্যাসিবাদকে প্রতিরোধ করার জন্য।”

মালিহা নামলাহ