ইসলামি পরিভাষায় আত্মশুদ্ধি বা ‘তাযকিয়াতুন নাফস’ হলো নিজের অন্তরকে যাবতীয় পাপাচার, অনৈতিকতা ও কলুষতা থেকে মুক্ত করে আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করা
আত্মশুদ্ধি বা ‘তাযকিয়াতুন নাফস’ একটি অপরিহার্য বিষয়, যার অর্থ অন্তরকে অশ্লীলতা, মন্দ চরিত্র ও আত্মিক রোগ থেকে পবিত্র করা এবং নেক আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা, যা ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির চাবিকাঠি। এটি মুমিনের জীবনের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, যা তাদের আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা বৃদ্ধি, রাসূল (সা.)-এর অনুসরণ এবং আত্মতুষ্টি ও অহংকার পরিহারের মাধ্যমে অর্জিত হয়, যা কুরআনে সফলতার একটি মাপকাঠি হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন, “নিশ্চয়ই সে সফলকাম হয়েছে, যে তার আত্মাকে পরিশুদ্ধ করেছে” (সূরা আশ-শামস, ৯১:৯)।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব ছিল মুমিনদের পরিশুদ্ধ করাআত্মিক উন্নতি মুমিনকে নফস (প্রবৃত্তি) ও শয়তানের ধোঁকা থেকে রক্ষা করে।
আল্লাহর প্রতি নিখাদ ভালোবাসা অর্জন করা।রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাহ ও আদর্শ অনুসরণ করা।ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে অন্তরকে সজ্জিত করা। যাবতীয় চারিত্রিক ও আত্মিক ত্রুটি সংশোধন করা।অন্যের সমালোচনা করার আগে নিজের দোষ সংশোধন করা।
মুমিনের অন্তর যখন পরিশুদ্ধ ও আলোকিত হয় এবং নিজ আখলাক-চরিত্র সংশোধন হয়, তখন তার জন্য আল্লাহ তাআলার রেযা-সন্তুষ্টি অর্জন সহজ হয়ে যায়। আর যে মুমিন আল্লাহর সন্তুষ্টি পায়, সে যে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠতর মানুষ তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না। এ জন্যই আমাদের প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের অন্যতম যিম্মাদারী ছিল সাহাবায়ে কিরামের তাযকিয়া বা আত্মশদ্ধি।
পবিত্র কুরআনে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দায়িত্ব ও জিম্মাদারীর বর্ণনা দিতে গিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলাই নিরক্ষরদের মাঝে তাদেরই স্বগোত্রীয় একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন। তিনি তাদের কাছে পাঠ করেন তাঁর আয়াতসমূহ, পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করেন তাদের আত্মাকে এবং শিক্ষা দেন কিতাব ও হিকমত।’ [ জুমুআ: ২]
সাহাবায়ে কিরামের মাঝে ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির এই পবিত্র দায়িত্ব তিনি আঞ্জাম দিয়েছেন যথাযথভাবে। তাই তার নূরানী সুহবত ও শানদার তরবিয়াতের বদৌলতে সাহাবায়ে কিরাম উম্মার শ্রেষ্ঠতর কাফেলার আসনে আসীন হয়েছেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে পেয়েছেন তাঁর আগাম রেযা ও সন্তুষ্টির ঘোষণা। আর নবুওয়াতের ভাষায় ‘নুযূমে হিদায়াত’ তথা হিদায়াতের উজ্জল নক্ষত্ররাজীর উপাধি পেয়েছেন। ইসলাহ ও আত্মশুদ্ধির পর তাঁদের অবস্থা কি হয়েছিল? সে সম্পর্কে সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. এর বর্ণনা হলো, কারো অনুসরণ করতে চাইলে সে যেন মৃত ব্যক্তিদের অনুসরণ করে। কারণ জীবত মানুষ ফিতনা থেকে নিরাপদ নয়। সেই ফিতনামুক্ত অনুসরণীয় ব্যক্তিরা হলেন হযরাত সাহাবায়ে কিরাম। তাঁরা ছিলেন এই উম্মতের সর্বোৎকৃষ্ট মানুষ।
যাদের আত্মা ছিল পূণ্যে পরিপূর্ণ, ইলমে ভরপুর। আর কৃত্রিমতা ছিল নিতান্ত কম। যাদেরকে স্বয়ং আল্লাহ তাআলা স্বীয় নবীর সাহচার্য, স্বীয় দীনের সংরক্ষণ ও প্রতিষ্ঠা করার জন্য নির্বাচন করেছিলেন। তাই তোমরা তাদের মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব সর্ম্পকে অবগত হও এবং তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ কর। আর সর্বশক্তি দিয়ে তাঁদের আখলাক ও সীরাতকে দৃঢ়তার সাথে আকড়ে ধর। কারণ তাঁরা ছিলেন সঠিক পথের উপর প্রতিষ্ঠিত। [মিশকাত :১/৩২]
মোদ্দা কথা, অন্তরকে সর্ব প্রকার চারিত্রিক ও আত্মিক রোগ-ব্যধি থেকে পবিত্র করা, নিজ আখলাক-চরিত্রকে সংশোধন করা এবং নেক আমলের অভ্যাস গড়ে তোলা প্রত্যেক মুমিনের অবশ্য কর্তব্য ও অপরিহার্য দায়িত্ব। এ জন্য প্রয়োজন একজন শায়খে কামিলের হাতে বাইআত হয়ে তাঁর সুহবত গ্রহণ ও প্রবল প্রচেষ্টা এবং উন্নত সাহস। মূলত তাসাওউফ ও আত্মশুদ্ধির পথে যে যত বেশি অগ্রসর হবে, আল্লাহর নৈকট্যও সে তত বেশী অর্জন করতে পারবে এবং সিক্ত হবে মাওলায়ে পাকের অবারিত রহমতের বারি ধারায়।
আত্মশুদ্ধির অন্তরায় (যা বর্জনীয়)
নিজেকে বড় মনে করা এবং আত্মতুষ্টিতে ভোগা, যা কল্যাণকর নয়।আল্লাহ ও মুমিনদের কাছে অপছন্দনীয়।
সুতরাং, মুমিনদের জন্য আত্মশুদ্ধি শুধু একটি ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং এটি তাদের ঈমানের পূর্ণতা ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য একটি মৌলিক ইবাদত।
ম/ম










