হারাগাছে পৌর বিএনপি আসলে ‘ভরসা বিএনপি’: আখতার হোসেন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফল পরবর্তী সহিংসতা ও পাল্টাপাল্টি কর্মসূচিতে উত্তাল রংপুরের হারাগাছ। আজ রোববার এনসিপি’র সদস্য সচিব ও নবনির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেনের প্রথম হারাগাছ সফরকে কেন্দ্র করে জনমনে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। সফরের কয়েক ঘণ্টা আগে এক দীর্ঘ ফেসবুক স্ট্যাটাসে আখতার হোসেন হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, “আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে, তার দায় এমদাদুল হক ভরসা এবং বিএনপির হাইকমান্ডকে নিতে হবে।”

আখতার হোসেন তার স্ট্যাটাসে বিস্ময় প্রকাশ করে লিখেছেন, দেশে বিএনপি সরকার গঠন করেছে, অথচ নতুন সরকারের আমলে প্রথম হরতাল ডাকা হয়েছে একজন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। তিনি অভিযোগ করেন, হারাগাছ পৌর বিএনপি আসলে ‘ভরসা বিএনপি’, যারা আন্দোলনের নামে বাড়িঘর ভাঙচুর, লুটপাট ও সহিংসতা চালাচ্ছে।

নির্বাচনের দিনের স্মৃতিচারণ করে আখতার হোসেন দাবি করেন, হারাগাছ পৌরসভায় ৫৬ হাজারের কাছাকাছি ভোটারের মধ্যে প্রায় ১৫-২০ হাজার ভুয়া ভোট দেখানোর পরিকল্পনা ছিল বিএনপি প্রার্থীর। তিনি নিজে বিভিন্ন কেন্দ্রে গিয়ে প্রিজাইডিং অফিসারদের কাছ থেকে কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেওয়ার মাধ্যমে এই জালিয়াতি ঠেকিয়েছেন। তার দাবি, এই ‘কূটচাল’ নস্যাৎ হওয়ার ক্ষোভ থেকেই বিএনপি কর্মীরা এখন সহিংস হয়ে উঠেছে।

এনসিপি নেতার অভিযোগ, নির্বাচনের পরদিন থেকে হারাগাছে তার নেতাকর্মীদের ওপর ব্যাপক তাণ্ডব চালানো হয়েছে। অনেক কর্মী এখনো বাড়িতে ফিরতে পারেননি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, “শাড়ি-লুঙ্গি দেওয়া ভরসা সাহেব কি তার কর্মীদের দ্বারা লুটপাটের শিকার হওয়া মায়েদের আর্তচিৎকার শুনতে পান?” আজ তিনি ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর পরিদর্শনে এবং নিপীড়িত শ্রমিকদের পাশে দাঁড়াতে হারাগাছে আসছেন বলে জানান।

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে আগেই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছেন বিএনপি প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। আখতার হোসেনের এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে তার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, হারাগাছ থানার ওসি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে এবং সংসদ সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

স্ট্যাটাসে আখতার হোসেন আরও জানান, “সরকার গঠন করেছে বিএনপি আর নতুন সরকারের আমলে প্রথম হরতাল হচ্ছে বিরোধী দলের সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে। রংপুর-৪ এর হারাগাছে আজ আমার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে এমদাদুল ভরসার পৌর বিএনপি। এনারা আসলে বিএনপি করেন না, ভরসা করেন। কিন্তু বিএনপির সরকার গঠনের আভাস পাওয়ার পর থেকে বাড়িঘর ভাঙচুর, লোক পেটানো, রক্তাক্ত করা, লুটপাট, ভয়ভীতি দেখানো, আন্দোলনের নামে সহিংসতা সব করছে বিএনপির নামে।

হারাগাছ প্রসঙ্গে: ১২ তারিখ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুরো দিন আমি হারাগাছ পৌরসভায় অবস্থান করি। খুবই খারাপ লাগছিলো কারন কোনও কেন্দ্রের সামনে এনসিপির শাপলা কলি মার্কার ব্যাচ ধারণ করে কাউকে দাঁড়াতে দেয়া হয়নি। ২০ টি কেন্দ্রের প্রত্যেক কেন্দ্রের সামনে শত শত ধানের শীষের লোক আর অল্প কিছু মানুষ শাপলা কলির। ব্যাচ না থাকায় তাদের দূর থেকে আলাদা করে চেনাও যায় না।

চর চাতুরী আদর্শ কেন্দ্রে গিয়ে শুনি ভরসার লোকেরা একটু আগেই আমার দুইজন কর্মীকে থাপ্পড় দিয়েছে। ওরা আর কেন্দ্রের কাছেও আসতে পারছে না। হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে দেখি কেন্দ্রের বাইরে শাপলা কলির ভোটার স্লিপ বিতরণের টেবিল ভরসার লোকেরা ভেঙে দিয়েছে। মোল্লাটারী কেন্দ্রে ভরসার লোকেরা শাপলা কলির কর্মীদের শাসিয়েছে, অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করেছে, লাঠি দেখিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছে। প্রায় প্রত্যেক কেন্দ্রে একই অবস্থা। প্রশাসনকে বলে, মিডিয়ায় উল্লেখ করে কোথাও কোনও সুরাহা পাওয়া যায় নি।

রংপুর-৪ আসনে সবসময় নির্বাচন নিয়ে একটা ভয় থাকে যে কাউনিয়া পীরগাছার বাকী সব কেন্দ্রে ফলাফল যা-ই হোক হারাগাছের প্রার্থী হারাগাছে যেমনে হোক ফলাফল ঘুরিয়ে দেবে। রংপুর-৪ এ ৫ লাখ ৯ হাজার ভোটারের মধ্যে একক এলাকা হিসেবে সবচে বেশি ভোট হারাগাছ পৌরসভায়। মোট ভোটার ৫৫,৪৫১ জন। এই ভোটগুলো নিয়েই এবারও ভরসার প্লান ছিলো। সেই প্লান কিছু তারা বাস্তবায়ন করেছে। কিন্তু ভরসার লোকদের হারাগাছের ভোটের সংখ্যা আরও বাড়িয়ে দেখানোর জালিয়াতি বন্ধ করতে পারায় শাপলা কলি জিতে আসতে সমর্থ হয়৷ তাদের সেই কূটচালের ক্ষোভ এখনও মেটেনি।

বিকাল বেলা আমরা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে শুরু করি। সারাদিন নির্বাচন নিয়ে ভরসার লোকেরা যা অনিয়ম, অত্যাচার করার করেছে কিন্তু হিসেবের সময় যেনো অতিরিক্ত ভোট দেখাতে না পারে সেই ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই হিসেবে আমি প্রত্যেক কেন্দ্রে কতো ভোট কাস্টিং হলো সেই হিসেব নিতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে যেতে শুরু করি। প্রায় কেন্দ্রগুলোতে প্রিসাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসাররা আমাকে অসহযোগিতা করেছেন। আমি ভোট গণনা বিষয়ক প্রার্থীর অধিকার বিষয়ক আইনের উল্লেখ করে করে কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। কোন মার্কায় কতো ভোট তখনও তার হিসেব বের হয়নি। শুধুমাত্র কোন বুথে, কোন কেন্দ্র কতটি ভোট পরেছে সেই হিসেব নিতে পারছিলাম। সময় উল্লেখ করে প্রিজাইডিং অফিসারকে দেখিয়ে সেসব ছোট নোট খাতায় লিখে রাখছিলাম।

কিন্তু হারাগাছ মডেল কলেজ কেন্দ্রে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিয়ে বের হতে গিয়ে দেখি শত শত ভরসার ভাড়া করা লোকেরা কেন্দ্রের গেট আটকিয়ে দিয়েছে। তারা আমাকে মারার হুমকি দিচ্ছে। ইট-পাটকেল ছুড়ছে। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগালি করছে। আমাকে তারা জ্যান্ত বের হতে দেবে না। এমতাবস্থায় আর্মি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। আমি কেন্দ্র থেকে জীবন নিয়ে বের হতে সক্ষম হই।

কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে ধানের শীষের প্রার্থী এমদাদুল ভরসা হাজির হন। তিনি প্রথমে আমাকে বাঁধা দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু আমার বলা আইনি যুক্তির কাছে হার মেনে নেন। এমনকি আমার সাথে পরবর্তী কেন্দ্রগুলোতে কাস্টিং ভোটের হিসেব নিতে রওয়ানা হন।

আমরা হাত ধরাধরি করে দরদী স্কুল কেন্দ্রে প্রবেশ করি। সেখানে কেবল ব্যালট বক্সগুলো খোলা হয়েছে। আমি এবং ভরসা সাহেবের পিএস কাস্টিং ভোটের হিসেব লিখে নেই। দূঃখের বিষয় হলো হিসেব নেয়ার সময় সেখানে শাপলা কলির কোনও এজেন্টে আমি পাইনি।

দরদী স্কুলের বাইরে বের হতেই দেখি ভরসা ভাইয়ের গাড়ির গ্লাস ভাঙা। গ্লাসের ভাঙা জায়গায় ছোট গ্লাসের টুকরোগুলো বাইরে বের হতে চাইছে। একটু তাকালেই বোঝা যায় ভেতর থেকে ভাঙা হয়েছে। মজার বিষয় হলো সেখানে ভরসা ভাইয়ের গাড়ির সামনে পুলিশের গাড়ি, পেছনে আমার গাড়ির পরেই কয়েকটা আর্মির গাড়ি। আর জনসাধারণের সেখানে প্রবেশাধিকার নাই। তবুও ভরসা ভাই এনসিপিকে গাড়ির গ্লাস ভাঙার দায়ে ফাঁসানোর চেষ্টা করলেন। মিথ্যা অভিযোগ দিলেন। তাঁর পিএস বললেন ভিডিও আছে তার কাছে। আমিও মেজিস্ট্রেটকে বললাম ভিডিও দেখে এনসিপির লোক হলেও গ্রেফতার করতে। অথচ ভিডিও এলো না, না কেউ গ্রেফতার হল আর না ভরসার লোকেরা গাড়ি ভাঙা নিয়ে কথা বলছে। নিজের ফাঁদে নিজে ফেঁসে যাবার ভয় ভরসার লোকেদের ভালোই ধরেছে বোঝা যাচ্ছে।

এরপর ১২ তারিখ সারাদিন গেলো, সারারাত গেলো, শাপলা কলি জিতে এলো। ভরসা সাহেব কোথাও কোনও মিডিয়ায় ভোট নিয়ে কোনও অনিয়ম, কোনও অসুষ্ঠতার অভিযোগ জানালেন না। হারাগাছে ভোটের অনিয়মের যে প্লান তার ছিলো সেই অভিযোগ নিজে আগেভাগে ভরসা করে কেমনে? এজন্য সারাদিন মনে মনে যে অনিয়মের প্লান তার থাকুক, মুখে মুখে সুষ্ঠু ভোটের কথাই বলে গেছেন ভরসা সাহেব।

নিজে হেরেছে, ভেবেছে সরকারও বোধহয় ১১ দলের হবে এজন্য কিছু সময় তাণ্ডব শুরু করেনি। এরপর যখনি বিএনপি সরকার গঠন করবে এমন আভাস আসতে শুরু করলো ১৩ তারিখ থেকে বেপরোয়া হয়ে উঠলো ভরসা বাহিনী। ভরসার লোকেরা হারাগাছে এনসিপির নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ভাঙচুর করতে শুরু করলো। অনেককে মেরে রক্তাক্ত করলো, লুটপাট চালালো।

একদিকে ভরসা নিজে শাড়ি-লুঙ্গি দেয় আর অন্যদিকে তার কর্মীদের দিয়ে লুটপাট চালায়। নির্বাচনের দশ দিন পার হলো হারাগাছে এনসিপির অনেক কর্মী এবং তাদের পরিবার এখনও বাড়িতে যেতে পারে নাই। শাড়ি-লুঙ্গি দেয়া ভরসা কি তার কর্মীদের দ্বারা বাড়ি ভাঙা, বিয়ের সময় গিফট পাওয়া স্বর্ণ লুটপাটের শিকার সেই অসহায় মায়ের চিৎকার শুনতে পায়? নাকি সেইসব অসহায় গৃহবধূর, শিশুর, মায়ের আর্তচিৎকারে ভরসার আনন্দ?

হারাগাছে ৫৫ হাজার ভোটের মধ্যে ২৭ হাজার পেয়েছে ভরসা, তার থেকে ২২ হাজার ভোট কমে ৫ হাজার ভোট পেয়েছি আমি৷ কিন্তু হারাগাছে প্রতিটা ভোট আমার কাছে হাজার ভোটের সমান৷ আমি আমার হারাগাছের ভোটার এবং সবার মর্যাদা রক্ষা করার লড়াইয়ে আছি।

ওদের প্লান ছিলো কাস্টিং ভোটের চেয়ে আর ১৫-২০ হাজার ভোট ধানের শীষে বেশি দেখানোর। কয়েকজন সাহসী মানুষকে সাথে নিয়ে আমরা সেই জালিয়াতি ঠেকিয়েছি। এট সবাইকে টার্গেটে নিয়ে হত্যার হুমকি দিচ্ছে ভরসা বাহিনী। তাদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলে রেখেছে। প্রশাসন এখনও কোনও পদক্ষেপ নেয়নি৷

আজ আমি হারাগাছে আসবো শুনে ভরসা বাহিনী সরকারে থেকে বিরোধী দলের একজন নেতার বিরুদ্ধে হরতাল ডেকেছে। মাইকিং করে দোকানপাট বন্ধ রাখার হুমকি দিচ্ছে। শুনলাম একটু আগে হরতাল প্রত্যাহার করেছে। কিন্তু বিক্ষোভ করবে তারা।

আমি হারাগাছে আমার প্রথম সফর করতে চেয়েছিলাম নির্বাচনের পরদিন। ভরসা বাহিনীর সন্ত্রাসের কারনে পারিনি। আজ আমি হারাগাছে আসবো ভরসা বাহিনীর দ্বারা ভেঙেচুরে রাখা বাড়িঘরগুলো দেখতে৷ বাড়ি ভাঙা, লুকিয়ে থাকা মানুষদের পাশে দ্বারাতে। তাদের জন্য বিচারের দাবি নিয়ে।

আর গত দেড় বছরে আমি হারাগাছ পৌরসভার জন্য তিন দফায় সাড়ে ৬ কোটি টাকা বিশেষ বরাদ্দ এনেছি৷ সেসব বরাদ্দের কিছু কাজ এখন শুরু হবে। সেই বরাদ্দগুলো কোন কোন খাতে খরচ হলে বেশি মানুষের উপকার হবে তা জানতে আজ হারাগাছে আসবো। কয়েকটি আধুনিক টয়লেট নির্মাণ করা যায় কিনা বা অন্য কিছু।

শেষ কথা, আমার হারাগাছে আসা নিয়ে যদি কিছু ঘটে তার দায় ভরসা এবং বিএনপির হাইকমাণ্ডকে নিতে হবে। আমরা হারাগাছের নিপীড়িত শ্রমিকদের পক্ষে কাজ করে যাব ইন শা আল্লাহ।”

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রংপুর-৪ (পীরগাছা ও কাউনিয়া) আসনে এনসিপির প্রার্থী আখতার হোসেন শাপলা প্রতীকে ১ লাখ ৪৯ হাজার ৯৬৬ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী এমদাদুল হক ভরসা পেয়েছেন ১ লাখ ৪০ হাজার ৫৬৪ ভোট।

নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ তুলে এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে রিটার্নিং কর্মকর্তা বরাবর অভিযোগ দেন ওই আসনের বিএনপির প্রার্থী এমদাদুল হক ভরসা। ভোট পুনর্গণনার দাবি জানান তিনি। এছাড়া নির্বাচনের পর দিন থেকে টানা চারদিন হারাগাছ, পীরগাছা ও কাউনিয়ায় বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ কর্মসূচি পালন করেন তার সমর্থকরা। সর্বশেষ জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ঘেরাও করে ভোট পুনর্গননা না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন এমদাদুল হক ভরসা।

লামিয়া আক্তার