বাংলাদেশে বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে রাজস্ব বাড়ানো এবং মূল্যস্ফীতি কমানোকে সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারিতে নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর এই দুটি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।
কম রাজস্ব আদায় ও উচ্চ মূল্যস্ফীতি অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ তার উত্তরাধিকার (সাকসেসর) নোট লিখেছেন। নতুন অর্থমন্ত্রীর প্রতি তিনি কর আদায় বাড়ানো ও মূল্যস্ফীতি কমানোর ওপর অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চলমান সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, আয়কর ব্যবস্থার ডিজিটালাইজেশন এবং কাস্টমস আধুনিকায়নে গুরুত্ব দেওয়ার জন্য তিনি বিশেষ সুপারিশ করেছেন। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
গত বুধবার বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশের নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন। নতুন সরকারে অর্থ মন্ত্রণালয় ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। নতুন অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর কাজ এগিয়ে নিতে সুবিধার জন্য কয়েক পৃষ্ঠার উত্তরাধিকার নোট রেখে গেছেন বিদায়ি অর্থ উপদেষ্টা। তার মতে, পরবর্তী সরকারের উচিত নতুন প্রকল্প শুরু করার পরিবর্তে চলমান সংস্কার কার্যক্রমকে আরো জোরদার করা।
উত্তরাধিকার নোটে মূল্যস্ফীতির প্রবণতা ও রাজস্ব খাতের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি মুদ্রা ও আর্থিক খাত, বৈদেশিক খাত এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগীর চলমান কর্মসূচির উল্লেখ রয়েছে। অর্থনীতিতে প্রধান সংস্কার প্রতিশ্রুতি ও চলমান কার্যক্রম, সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা এবং নীতি-অগ্রাধিকার সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। ‘বাংলাদেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঝুঁকি এবং নীতি-অগ্রাধিকার’ শীর্ষক নামে এই নোট নতুন অর্থমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করবেন অর্থ সচিব।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম মাস জানুয়ারিতে বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের দাম কিছুটা বাড়ায় সার্বিক মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে জানুয়ারিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮.৫৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে যা ছিল ৮.৪৯ শতাংশ। গত আট মাসের মধ্যে জানুয়ারিতে সর্বোচ্চ মূল্যস্ফীতি হয়েছে। টানা তিন মাস মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। এর আগে মধ্যের কয়েক মাস কিছুটা কমেছিল।
বর্তমানে দেশি ও বিদেশি উত্স মিলিয়ে সরকারের ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৩ লাখ কোটি টাকা। কাঙ্ক্ষিত রাজস্ব আহরণ না হওয়ায় সরকারকে বেশি পরিমাণ ঋণ নিতে হচ্ছে। ফলে ঋণ ও সুদ পরিশোধে বাজেটের বড় অংশ ব্যয় হয়ে যাওয়ায় অন্যান্য যৌক্তিক খাতে বরাদ্দ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এ প্রেক্ষাপটে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিদায়ী অর্থ উপদেষ্টা।
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে রাজস্বনীতি প্রণয়ন এবং রাজস্ব আদায় কার্যক্রম আলাদা করার লক্ষ্যে এনবিআরকে দুই ভাগে বিভক্ত করার অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, একটি সংস্থা রাজস্ব আদায় ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করবে এবং অন্য সংস্থা করনীতি প্রণয়ন, গবেষণা ও সংস্কার কার্যক্রম দেখভাল করবে। তবে এখনো এ বিভাজন কার্যকর হয়নি। এটি দ্রুত বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্যান্য সংস্কারও অব্যাহত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
অন্তর্বর্তী সরকার সবচেয়ে বেশি খারাপ অবস্থায় পেয়েছিল ব্যাংক খাত। এ খাতে গত দেড় বছরে বেশ কিছু সংস্কার উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে। এই সংস্কারমূলক কাজ এগিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে সামষ্টিক অর্থনীতির চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বেশ কিছু সুপারিশ করা হয়েছে।
-মামুন










