সংসদেই হোক রাজনীতির সমাধান

দীর্ঘ সময় পর দেশের জনগণের সরাসরি ভোটে একটি নতুন সরকার গঠন করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। জুলাইয়ের উত্তাল গণ-অভ্যুত্থানের পর গত দেড় বছর দেশ কোনো রাজনৈতিক সরকারের অধীনে ছিল না। এর আগে দীর্ঘ দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে একধরনের অঘোষিত স্বৈরশাসন, স্বেচ্ছাচারী ও জনবিচ্ছিন্ন সংসদ প্রত্যক্ষ করেছে এই জনপদ। সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর এবার ব্যালটের মাধ্যমে জনতা তাদের রায় দিয়েছে। নির্বাচনের ফলাফলও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। বিজয়ী জনপ্রতিনিধিরা এখন রাষ্ট্র পরিচালনার নতুন অধ্যায় শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

জানা যায়, দীর্ঘ সময় পর জনগণের সরাসরি ভোটে নতুন সরকার গঠন করেছে। দেড় বছর রাজনৈতিক সরকারহীন সময় ও দীর্ঘ স্বৈরশাসনের অভিজ্ঞতার পর মানুষ ব্যালটের মাধ্যমে তাদের রায় দিয়েছে। তবে নির্বাচনের পর কিছু জায়গায় সহিংসতার খবর উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তথ্যমতে, গত সময়ে সংসদ কার্যকর না থাকায় জনদাবি রাজপথে গড়িয়েছে, যার ফলে সহিংসতা, মামলা, যানজট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বেড়েছে। এখন নতুন সরকারের বড় দায়িত্ব হবে আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, সংসদকে কার্যকর করা এবং জনগণের কণ্ঠকে সেখানে তুলে ধরা। মানুষ চায়- রাজনীতির সমাধান হোক সংসদে, রাজপথে নয়। দায়িত্বশীল সরকার ও শক্তিশালী বিরোধী দলের মাধ্যমে শান্তি, জবাবদিহি ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই এখন সবার প্রত্যাশা।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে পারে। এ লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংসদ সচিবালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন শুরুর বিষয়ে আলোচনা ও প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে।

সংসদ সচিবালয়ের তথ্য বলছে, নির্ধারিত সময়ের আগেই ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি রমজানের মধ্যে জাতীয় সংসদ ভবনে বসতে যাচ্ছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের প্রথম অধিবেশন। বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের ২ নম্বর উপধারা অনুযায়ী, জাতীয় নির্বাচনের ফলাফলের সরকারি গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশন আহ্বান করতে হবে। এর আগে বিগত ১২টি জাতীয় সংসদের মধ্যে মাত্র তিনটির প্রথম অধিবেশন রমজান মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

সংবিধান অনুযায়ী, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে রাষ্ট্রপতিকে নতুন সংসদের অধিবেশন আহ্বান করতে হয় এবং তিনি তা প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শক্রমে করেন। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী সদস্যদের গেজেট প্রকাশিত হওয়ায় আগামী ১৪ মার্চের মধ্যেই প্রথম অধিবেশন বসার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথ নিয়েছেন।

এদিকে, আসন্ন জাতীয় সংসদ অধিবেশন আহ্বান বিষয়ে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা পাওয়ার কথা এখনো জানানো হয়নি বলে সংসদ সচিবালয়ের সচিব কানিজ মওলা জানিয়েছেন। তবে, চলতি মাসের আগামী ২৬ ফেব্রুয়ারি অধিবেশন বসা নিয়ে কী আলোচনা হয়েছে এমন প্রশ্নে আলোকিত স্বদেশকে তিনি বলেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশন ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কারণ, শপথ গ্রহণের এক মাসের মধ্যে সংসদ অধিবেশন বসার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

কানিজ মওলা আরও জানান, ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন ও পরদিন ফল ঘোষণার পর দ্রুত সরকার গঠন, মন্ত্রিসভার শপথ এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম শুরু হওয়ায় সংসদীয় অধিবেশনের প্রস্তুতিও এগিয়ে চলছে সমানতালে। এর মধ্যে সংরক্ষিত নারী আসনের তফসিল ঘোষণা ও নির্বাচন সম্পন্ন করার উদ্যোগ নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। কমিশনের লক্ষ্য, রোজার ঈদের আগেই নারী আসনের নির্বাচন শেষ করে সংসদকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেয়া।

এ প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার (ইসি) আব্দুর রহমানেল মাছউদ বলেছেন, ঈদুল ফিতরের আগেই সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে। সরাসরি ভোটে জয়ী দলগুলোর আসন সংখ্যার অনুপাতে নারী আসন বণ্টন করা হয়। সংসদের সাধারণ আসনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনের ভোটার হন।

ইসি সূত্র মতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে ভোট হয় এবং ২৯৭টির ফল ঘোষণা করা হয়েছে। এতে বিএনপি ২০৯টি আসন পেয়েছে এবং তাদের জোটের শরিকরা আরও তিনটি আসনে জয়ী হয়েছে। স্থগিত থাকা দুটি আসনেও বিএনপির প্রার্থীরা এগিয়ে রয়েছেন। অন্যদিকে, জামায়াতে ইসলামী ৬৮টি আসন পেয়েছে। তাদের নেতৃত্বাধীন জোটের শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি ছয়টি, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস দুটি, খেলাফত মজলিস একটি আসনে জয়ী হয়েছে। এছাড়া ইসলামী আন্দোলন একটি এবং স্বতন্ত্র সাতজন সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, যাদের সবাই বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী।

সংবিধান অনুযায়ী, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি ভাষণ দেবেন। এর আগে সেই ভাষণ মন্ত্রিসভায় অনুমোদন করা হবে এবং অধিবেশনজুড়ে সদস্যরা ভাষণের ওপর আলোচনা করবেন। এদিকে, স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদ শূন্য থাকায় প্রথম দিনের বৈঠকে কে সভাপতিত্ব করবেন তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এর আগে দ্বাদশ সংসদের স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করেন এবং ডেপুটি স্পিকার শামসুল হক টুকু গ্রেপ্তার হন। ফলে এবার সংসদ সদস্যদের শপথ পড়ান প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন।

সংসদের কার্যপ্রণালি বিধিতে এ ধরনের পরিস্থিতিতে অধিবেশনের সভাপতিত্বের বিষয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা না থাকলেও অতীতে জ্যেষ্ঠ সদস্যকে দায়িত্ব দিয়ে স্পিকার নির্বাচনের নজির রয়েছে। এবারও তেমন কোনো পদ্ধতি অনুসরণ করা হতে পারে বলে সংসদ সচিবালয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের পর সভাপতিমণ্ডলী মনোনয়ন ও শোক প্রস্তাব গ্রহণ করা হবে এবং পরে রাষ্ট্রপতির ভাষণের মাধ্যমে দিনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শেষ হবে।

এদিকে, ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় দল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সংসদ নেতা নির্বাচিত করেছে। তবে স্পিকার, উপনেতা ও চিফ হুইপ এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। অন্যদিকে, বিরোধী জোটের সংসদীয় দল ইতিমধ্যে বিরোধীদলীয় নেতা, উপনেতা ও চিফ হুইপ মনোনীত করেছে। জুলাই জাতীয় সনদ ও ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী অঙ্গীকার অনুযায়ী এবার ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে হওয়ার কথা রয়েছে। ত্রয়োদশ নির্বাচনে জামায়াত এককভাবে দেশের ইতিহাসে চতুর্থ বৃহত্তম বিরোধী দল। ইতোমধ্যে দলটির আমির ডা: শফিকুর রহমানকে বিরোধী দলীয় নেতা এবং নায়েবে আমির ডা: সৈয়দ আবদুল্লাহ মো: তাহেরকে উপনেতা নির্বাচিত করা হয়েছে। সংসদ অধিবেশন বসলেই তাদের স্বীকৃতি দেয়া হবে।

তবে, প্রথম অধিবেশনের অগ্রাধিকারমূলক কাজের মধ্যে রয়েছে- অধ্যাদেশ উত্থাপন ও অনুমোদন। নির্বাচন-পূর্ব জারি করা কোনো অধ্যাদেশ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাস না হলে বাতিল হয়ে যায়। তাই সরকার চাইলে সেগুলো বিল আকারে উত্থাপন করতে পারে। অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক বা আইনশৃঙ্খলাজনিত জরুরি বিলও আসতে পারে। প্রশ্নোত্তর পর্ব চালু, জরুরি জনস্বার্থ প্রস্তাব গ্রহণ এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি- যেমন পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটি ও এস্টিমেটস কমিটি গঠনের প্রক্রিয়াও শুরু হতে পারে।

ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনের বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এবং অর্থ ও পরিকল্পণা মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা ও জনগণের কাছে জবাবদিহি থাকবে, এমন সরকার গঠনেই সব সমস্যার সমাধান হবে। বাংলাদেশের সব সমস্যার সমাধান সংসদে হতে হবে; এর বাইরে কোনো সমাধান নেই। অন্য কোনো গোষ্ঠী বা ব্যক্তির কাজ নয় বাংলাদেশের সংবিধান, বিচার বিভাগ বা বিভিন্ন সমস্যার সমাধান সংসদেই দেওয়া হয়।

-জোহা