দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) মূল্যায়নে অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে বাংলাদেশে দুর্নীতি পরিস্থিতির সামান্য উন্নতি হয়েছে। তাতে বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান এক ধাপ উন্নতি ঘটেছে।

মঙ্গলবার দুর্নীতিবিরোধী এ আন্তর্জাতিক সংস্থাটির দুর্নীতির ধারণা সূচকে (সিপিআই) ২০২৫-এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন প্রকাশ উপলক্ষে এ তথ্য তুলে ধরা হয়।

টিআইবির ধানমন্ডি কার্যালয়ে আউটরিচ অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামের সঞ্চালনায় সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

দুর্নীতি প্রতিরোধে অভূতপূর্ব সুযোগ হাতছাড়া করেছে অন্তর্বর্তী সরকার– এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকারকে হটিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছিল। কিন্তু এ সরকার দুর্নীতি প্রতিরোধে ব্যর্থ হয়েছে। স্বল্প সময়ে দেশ থেকে দুর্নীতির মূল উৎপাটন করে ফেলবে– এমনটা এই সরকারের কাছে কেউ প্রত্যাশা করেনি। সবার প্রত্যাশা ছিল– কীভাবে দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে হয়, অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনায় কীভাবে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তার দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে এ সরকার। এক্ষেত্রে তারা ব্যর্থ, সুযোগ নষ্ট করেছে। দেশে আগের মতোই ‘চোরতন্ত্র’ বহাল তবিয়তে অবস্থান করছে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, বাংলাদেশের স্কোর ২০২৪ সালের তুলনায় ১ পয়েন্ট বেড়ে ২৪ পয়েন্টে উন্নীত হয়েছে, যা ধারণা দেয়– দুর্নীতি রোধে কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তবে বৈশ্বিক বিবেচনায় দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান দাঁড়িয়েছে ১৩তম, যা আগের বছর ছিল ১৪তম। অর্থাৎ খারাপের দিকে এক ধাপ এগিয়েছে।

সিপিআই মূলত শূন্য থেকে ১০০ স্কেলে দুর্নীতির ধারণামাত্রা পরিমাপ করে। যেখানে ‘শূন্য’ মানে দুর্নীতিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এবং ‘১০০’ মানে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত বা সর্বাধিক সুশাসিত। এখন পর্যন্ত কোনো দেশই এই সূচকে শতভাগ স্কোর অর্জন করতে পারেনি। অর্থাৎ দুর্নীতি কম হলেও একেবারে শূন্য নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা হয়, এ বছরও বিশ্বের সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ ডেনমার্কের স্কোর ৮৯। অথচ বাংলাদেশ যে দেশের একটি কোম্পানির সঙ্গে বন্দরসেবা চুক্তি করেছে, সেই ডেনমার্কের ওই কোম্পানিকেই সম্প্রতি ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার জরিমানা গুনতে হয়েছে। বোঝাই যাচ্ছে, কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশেও দুর্নীতি করে এমন কোম্পানি আছে।

বাংলাদেশের স্কোর ১০০-এর মধ্যে ২০২৪ সালের তুলনায় গত বছরের হিসাবে ১ পয়েন্ট বেড়ে ২৪ হয়েছে। টিআইবির নির্বাহী প্রধান জানান, এই ১ পয়েন্ট বৃদ্ধির কারণ হতে পারে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দুর্নীতি প্রতিরোধে বাংলাদেশের যে সুযোগ তৈরি হয়েছে, এ কারণে তথ্যদাতারা ১ পয়েন্ট বেশি দিয়েছেন। সরকারের হাতে সুযোগ ছিল দুর্নীতি প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও ভালোর দিকে নিয়ে যাওয়া। তা সত্ত্বেও দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের এক ধাপ অবনমনের কারণ অন্য দেশগুলো দুর্নীতি রোধে তুলনামূলক ভালো করেছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের এ সময়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান আরও দুর্বল হওয়ার ব্যাখ্যায় ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকার ব্যবস্থাকে হটানোর পর ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে একপক্ষকে হটিয়ে আরেকপক্ষ দখলবাজি, দলবাজিতে নেমেছিল। সচিবালয়ের ভেতরে এটা হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকার এটা প্রতিহত করতে পারেনি, বরং এ ব্যবস্থায় আমলাতন্ত্রের কাছে এক প্রকার ‘আত্মসমর্পণ’ করেছে। তারা দুর্নীতি প্রতিরোধে সফলতা দেখাতে পারেনি। তাদের অধিকাংশ পদক্ষেপ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি ছিল না, অন্তর্বর্তীমূলক তো নয়ই।

তিনি আরও জানান, দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে আফগানিস্তানের পর দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে এবং এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ৩২ দেশের মধ্যে চতুর্থ সর্বনিম্ন। বৈশ্বিকভাবে ১৮০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ রয়েছে সর্বনিম্ন কুইন্টাইলে (১৫০তম), যা ‘দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ হারানো দেশগুলোর’ এক কাতার বলে নির্দেশ করে।

টিআইর বিশ্লেষণে উঠে এসেছে, ২০১২ থেকে ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশের গড় স্কোর ছিল ২৬; কিন্তু ২০২৫ সালে তা নেমে এসেছে ২৪-এ, যা গড়ের চেয়ে ২ পয়েন্ট কম এবং ২০১৭ সালে অর্জিত সর্বোচ্চ ২৮ স্কোরের তুলনায় ৪ পয়েন্ট কম। গত দশকে (২০১৬-২০২৫) দেশটি ২ পয়েন্ট হারিয়েছে। বৈশ্বিক গড় স্কোর যেখানে ৪২, সেখানে বাংলাদেশের স্কোর ১৮ পয়েন্ট কম। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের গড় ৪৫, সেখান থেকেও বাংলাদেশ ২১ পয়েন্ট পিছিয়ে।

সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনকে (দুদক) স্বাধীন ও কার্যকর করার সুপারিশ বাস্তবায়ন হয়নি। বরং দুদকের অকার্যকারিতা ও জবাবদিহিহীনতা রক্ষার মতো অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। সরকারের একেবারে শেষে এসে উপদেষ্টাদের সম্পদের তথ্য প্রকাশ ‘প্রহসন’ ছাড়া অন্য কিছু হবে না।

টিআইর প্রতিবেদন তুলে ধরে ইফতেখারুজ্জামান জানান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, লাওস ও ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ডিজিটাল ব্যবস্থা ও কঠোর বিচারিক পদক্ষেপের মাধ্যমে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি দেখিয়েছে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে শ্রীলঙ্কা এবার ৩ পয়েন্ট বেশি স্কোর করেছে।

টিআইবির প্রধান বলেন, দুর্নীতি কোনো অনিবার্য বাস্তবতা নয়। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠা করা গেলে বাংলাদেশেও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব।

তিনি পরবর্তী সরকারের প্রতি আহ্বান জানান– দুদককে স্বাধীন করা, সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করা, অর্থ পাচার রোধে আইন সংস্কার, দলীয়করণমুক্ত প্রশাসন নিশ্চিত করা এবং গণমাধ্যম ও সিভিক স্পেসের পূর্ণ স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সুশাসনের ভিত্তি মজবুত করতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে ৮৯ স্কোর পেয়ে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকার শীর্ষে অবস্থান করছে ডেনমার্ক। ৮৮ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে ফিনল্যান্ড এবং ৮৪ স্কোর পেয়ে তৃতীয় স্থানে সিঙ্গাপুর। অন্যদিকে ৯ স্কোর নিয়ে সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় যৌথভাবে শীর্ষে দক্ষিণ সুদান ও সোমালিয়া। ১০ স্কোর নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে ভেনেজুয়েলা এবং ১৩ স্কোর পেয়ে যৌথভাবে তৃতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে ইয়েমেন, লিবিয়া ও ইরিত্রিয়া। ২০২৫ সালের দুর্নীতির ধারণাসূচকে দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে ১০০-এর স্কেলে ভুটানের স্কোর ৭১। অর্থাৎ এ অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ। এ ছাড়া দুর্নীতির ধারণাসূচকে ১০০ পয়েন্টের মধ্যে ভারত ও মালদ্বীপের পয়েন্ট ৩৯, শ্রীলঙ্কার ৩৫, নেপালের ৩৪, পাকিস্তানের ২৮ ও আফগানিস্তানের ১৬।

ড. ইফতেখারুজ্জামান জানান, দুর্নীতির ধারণাসূচক গণনায় টিআইর বাংলাদেশ চ্যাপ্টারের অর্থাৎ টিআইবির কোনো ভূমিকা থাকে না। এমনকি টিআইবির গবেষণা থেকে প্রাপ্ত কোনো তথ্য বা বিশ্লেষণ সিপিআইতে অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ নেই।

আওয়ামী লীগের ভুল স্বীকার করা উচিত
বর্তমান রাজনৈতিক অবস্থার জন্য প্রথম দায়ী দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে– এমন মন্তব্য করেছেন টিআইবি নির্বাহী পরিচালক। তিনি বলেন, যদি আওয়ামী লীগ অনুশোচনা করে, ভুল স্বীকার করে এবং রাজনৈতিকভাবে ফিরে আসতে চায়, আমি বিশ্বাস করি, দেশের মানুষ তাদের গ্রহণ করবে। কিন্তু সেটা তারা করবে কিনা, তা পুরোপুরি তাদের ওপরই নির্ভর করছে।

আওয়ামী লীগকে বাইরে রেখে যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে, তাকে কি অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন বলা যাবে– এমন প্রশ্নের উত্তরে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, আওয়ামী লীগ প্রকাশ্যে নির্বাচনবিরোধী অবস্থান ঘোষণা করেছে। ফলে দলটি নিজেই নির্বাচন বর্জন করেছে।

-সাইমুন