সোমালিয়া সৌদি আরবের সঙ্গে একটি “সামরিক সহযোগিতা” চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এর কয়েক সপ্তাহ আগেই দেশটি কাতারের সঙ্গে একই ধরনের একটি চুক্তি করে। বিচ্ছিন্নতাবাদী অঞ্চল সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতির বিরুদ্ধে আঞ্চলিক সমর্থন জোরদার করার অংশ হিসেবেই এই কূটনৈতিক উদ্যোগ নিচ্ছে মোগাদিশু। সোমালিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী আহমেদ মুআল্লিম ফিকি ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ বিন সালমান বিন আবদুলআজিজ সোমবার রিয়াদে একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। খবর আলজাজিরার।
সোমালিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, এই চুক্তির লক্ষ্য হলো দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা ও সামরিক সহযোগিতার কাঠামো জোরদার করা। এতে উভয় দেশের কৌশলগত স্বার্থ সংশ্লিষ্ট একাধিক ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী যুবরাজ খালিদ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে চুক্তির বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তবে দুই দেশই চুক্তির বিস্তারিত প্রকাশ করেনি।
গত মাসে সোমালিয়া কাতারের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষর করে, যার উদ্দেশ্য ছিল সামরিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করা। সোমালিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থার মতে, ওই চুক্তিতে সামরিক প্রশিক্ষণ, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা বৃদ্ধির বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল। কাতার সরকার জানায়, এই চুক্তি পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা ও প্রতিরক্ষা অংশীদারত্ব জোরদারের লক্ষ্যেই করা হয়েছে। ইসরায়েল গত ডিসেম্বর প্রথমবারের মতো সোমালিল্যান্ডকে স্বীকৃতি দেওয়ার পর আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়ে যায়। এই প্রেক্ষাপটেই সোমালিয়া কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। মোগাদিশু সতর্ক করে জানিয়েছে, ইসরায়েল সোমালিল্যান্ডে একটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের পরিকল্পনা করছে, যেখান থেকে পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর ওপর হামলা চালানো হতে পারে।
সোমালিয়ার প্রেসিডেন্ট হাসান শেখ মোহামুদ গত সপ্তাহে আল জাজিরাকে বলেন, সোমালিল্যান্ডে কোনো ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন “কখনোই অনুমোদন করা হবে না”। তিনি বলেন, “আমরা আমাদের সক্ষমতার মধ্যে থেকে লড়াই করব। আমরা নিজেদের রক্ষা করব এবং কোনো ইসরায়েলি বাহিনী প্রবেশ করলে তার মোকাবিলা করব।” জানুয়ারিতে সোমালিল্যান্ডের এক কর্মকর্তা ইসরায়েলের চ্যানেল ১২-কে বলেন, একটি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির বিষয়টি আলোচনায় রয়েছে, যদিও শর্তাবলি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
এদিকে, গত মাসে সোমালিয়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে সব ধরনের চুক্তি বাতিল করে দেয়। এর মধ্যে বন্দর পরিচালনা, নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত চুক্তিও ছিল। সোমালিয়ার অভিযোগ, আমিরাতের কিছু কার্যক্রম দেশটির জাতীয় ঐক্য ও রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এই সিদ্ধান্ত আসে এমন প্রতিবেদনের প্রেক্ষাপটে, যেখানে বলা হয়, আমিরাত সোমালিল্যান্ডকে ইসরায়েলের স্বীকৃতি পেতে সহায়তা করেছে। ২০২০ সালে আব্রাহাম চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা আমিরাত সোমালিল্যান্ডের সঙ্গে গভীর অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। এর মধ্যে রয়েছে কৌশলগত বেরবেরা বন্দরের ওপর ডিপি ওয়ার্ল্ডের ৩০ বছরের ইজারা।
ইসরায়েলের সোমালিল্যান্ড স্বীকৃতির নিন্দা জানিয়ে প্রস্তাবিত যৌথ আরব-ইসলামিক বিবৃতিতে সই করতে অস্বীকৃতি জানায় আমিরাত। তবে জানুয়ারিতে আফ্রিকান ইউনিয়নের সঙ্গে দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে তারা সোমালিয়ার সার্বভৌমত্ব, ভৌগোলিক অখণ্ডতা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করে। সৌদি আরব ও আমিরাতের মধ্যকার সম্পর্কের অবনতি ঘটার সময়েই আমিরাতের সঙ্গে সোমালিয়ার এই বিচ্ছেদ ঘটে। ডিসেম্বরে সৌদি বাহিনী ইয়েমেনে আমিরাতের অস্ত্রবাহী একটি চালান লক্ষ্য করে হামলা চালায় বলে অভিযোগ ওঠে। রিয়াদের দাবি, ওই অস্ত্র চালানটি ইয়েমেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের জন্য পাঠানো হচ্ছিল। সৌদি আরব ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের পক্ষ নিয়ে দেশটি থেকে আমিরাতি বাহিনী প্রত্যাহারের আহ্বানও সমর্থন করে।
আমিরাত এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। একই সঙ্গে, সুদানে প্রায় তিন বছর ধরে চলমান যুদ্ধে আধাসামরিক র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসকে সমর্থনের অভিযোগও উঠেছে আমিরাতের বিরুদ্ধে। সৌদি আরব, যা সুদানের সরকারের মিত্র, কোরদোফান অঞ্চলে আরএসএফের হামলার নিন্দা জানিয়েছে। ওই হামলায় নারী ও শিশুসহ বহু মানুষ নিহত হয়েছে। রিয়াদ সুদানে “বিদেশি হস্তক্ষেপের”ও নিন্দা জানায় এবং বলে, অবৈধ অস্ত্র, ভাড়াটে সেনা ও বিদেশি যোদ্ধাদের প্রবাহ যুদ্ধ দীর্ঘায়িত করছে। তবে তারা নির্দিষ্ট কোনো দেশের নাম উল্লেখ করেনি।
এর আগে, সুদান আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে আমিরাতের বিরুদ্ধে মামলা করে, যেখানে পশ্চিম দারফুরে মাসালিত জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সংঘটিত কথিত গণহত্যায় আরএসএফকে সহায়তার অভিযোগ আনা হয়। আমিরাত এই মামলাকে “প্রচারমূলক নাটক” বলে অভিহিত করে এবং তাৎক্ষণিকভাবে মামলা খারিজের দাবি জানায়।
-বেলাল হোসেন










