ঢাবিতে পুনঃভর্তির সুযোগ পাওয়া ৬ ছাত্রদল নেতাকর্মীর সিট বাতিলের দাবি এফএইচ হল সংসদের 

২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেনের সূচনালগ্ন থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পর্যন্ত বিভিন্ন রাজনৈতিক প্রতিহিংসা/নির্যাতনের কারণে যথাসময়ে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে পারেননি-  এমন ২৯ ছাত্রদল নেতাকর্মীদেরকে গত বছর পুনঃভর্তির সুযোগ দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রশাসন। তাদের মধ্যকার ৬ জনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক মুসলিম (এফএইচ) হলে সিট বরাদ্দ দেওয়া হয়। এবার তাদের সিট বাতিলের জোরালো দাবি জানিয়েছে হল সংসদের নেতারা।

তাদের অভিযোগ, হলের প্রভোস্ট ‘সিট খালি থাকা সাপেক্ষে’ শর্তটি লঙ্ঘন করে এবং ২৪-২৫ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের সিট নিশ্চিত না করেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে এই ৬ ছাত্রদল নেতাকে সিট বরাদ্দ দিয়েছেন।

তারা আরও বলছেন, এই ৬ জনের মধ্যে ৫ জন শিক্ষার্থী এখনো ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত এবং বিগত এক বছরে তাদের ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো নজির নেই। এসব অভিযোগ তুলে তাদের ৬ জনের সিট বাতিলের দাবি জানিয়ে হল সংসদের ভিপি খন্দকার মোহা. আবু নাঈম, জিএস মো. ইমামুল হাসান এবং এজিএস মহসীন উদ্দিন (শাফি) গতকাল রবিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন।

বিবৃতিতে বলা হয়, গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে ডিন’স কমিটির সভায় ছাত্রদলের ২৯ জন নেতাকর্মীকে রাজনৈতিক কারণে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে পারেনি- এই বিবেচনায় পুনর্ভর্তির সিদ্ধান্ত এবং পরবর্তীতে ১৪ আগস্ট ২০২৫ তারিখে প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় ‘সিট খালি থাকা সাপেক্ষে’ তাদের সিট বরাদ্দের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় যাদের মধ্যে ২০০৫-০৬ সেশন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেশনের শিক্ষার্থীরা আছে। কিন্তু ফজলুল হক মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. ইলিয়াস আল মামুন উক্ত শর্ত লঙ্ঘন করে এবং ২৪-২৫ সেশনের নবীন শিক্ষার্থীদের সিট নিশ্চিত না করেই নিয়ম বহির্ভূতভাবে ৬ জন ছাত্রদল নেতাকে সিট বরাদ্দ দিয়েছেন। ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদ এই অনিয়মের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

অভিযোগ জানিয়ে হল সংসদ নেতারা বলেন, এই ৬ জনের মধ্যে ৫ জন শিক্ষার্থী এখনো ১ম বর্ষে অধ্যয়নরত এবং বিগত এক বছরে তাদের ক্লাস বা পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কোনো নজির নেই। এছাড়া, তাদের মধ্যে একাধিক শিক্ষার্থী পূর্বে ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া নিয়ে মারামারি ও পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বনের দায়ে হল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল।

বিবৃতিতে তারা জানান, এ বিষয়ে গত ১৯ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে মাননীয় উপাচার্য বরাবর লিখিত অভিযোগ করা হলে, প্রভোস্ট কমিটির আহ্বায়ক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন স্যারকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। অত্যন্ত দুঃখজনক যে, মাননীয় উপাচার্যের প্রত্যক্ষ নির্দেশনার পরেও গত আড়াই মাসে এই কমিটির কোনো সভা অনুষ্ঠিত হয়নি এবং একাধিকবার সময় নির্ধারণ করার পরেও নির্ধারিত সময়ে মিটিং করতে অস্বীকৃতি জানানো হয়েছে। কমিটির আহ্বায়কের কালক্ষেপণ ও সভা বাতিল করার প্রবণতাকে আমরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করি।

সবশেষে বিবৃতিতে হল সংসদ নেতারা বলেন, এভাবে অবৈধভাবে অছাত্র ও বিতর্কিতদের হলে থাকার সুযোগ করে দেওয়া ক্যাম্পাসে পুনরায় গণরুম-গেস্টরুমের মতো ঘৃণ্য সংস্কৃতি ও কলুষিত ছাত্ররাজনীতি ফিরিয়ে আনার একটি গভীর ষড়যন্ত্র। এমতাবস্থায়, ফজলুল হক মুসলিম হল সংসদ এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে এবং অনতিবিলম্বে উক্ত ৬ জনের অবৈধ সিট বাতিল করার জোর দাবি জানাচ্ছে।

জানা গেছে, পুনঃভর্তির সুযোগ পাওয়াদের  তালিকায় ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের তিনজন, ২০০৬-০৮ শিক্ষাবর্ষের একজন, ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের দুইজন, ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের ৪ জন, ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের ৪ জন, ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের ৩ জন, ২০১১-১২ এবং ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের একজন করে মোট দুইজন, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের ৩ জন করে মোট ৯ জন এবং ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের একজনসহ মোট ২৯ জনের নাম আছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব শিক্ষার্থীর প্রত্যেককে প্রতি বছর টাইম-বার্ড এর জন্য ৫ হাজার টাকা করে জরিমানা প্রদানের শর্তে বিশেষ বিবেচনায় স্ব স্ব বিভাগ/ইনস্টিটিউটে পুনঃভর্তির অনুমতি দেওয়া হয়। তালিকার ২৯ তাদের মধ্যে দুই জন কলা অনুষদ, ৯ জন বিজ্ঞান অনুষদ, ৪ জন ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ, দুই জন সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদ, ৩ জন জীববিজ্ঞান অনুষদ, ৭ জন ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি অনুষদ, একজন চারুকলা অনুষদ এবং একজন পুষ্টি ও খাদ্য বিজ্ঞান অনুষদের ছাত্র।
তালিকায় থাকা পরিসংখ্যান বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের মো: শাকির আহমেদ, গণিত বিভাগের ২০০৮-৯ শিক্ষাবর্ষের সজীব মজুমদার, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের মো: ওমর সানি, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের সালেহ মো. আদনান, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের এসএম দিদারুল ইসলাম, পুষ্টি ও খাদ্য বিদ্যানি ইনস্টিটিউটের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের মো. এমরান আলী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির নেতা।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের একেএনএম রাশেদ আল আমীন বর্তমানে ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক সদস্য। রসায়ন বিভাগের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের শেখ আল ফয়সাল, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের মো. কামাল পাশা, ইতিহাস বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের আ স ম মাশুক বিল্লাহ, মনোবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের মো. ঝলক মিয়া, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের এসএম ইসামন্তাজ কেন্দ্রীয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ইউনিটের নেতা ছিলেন।

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের মো. ফাহিম ফয়সাল, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের মো. রুবেল পারভেজ, ইলেকট্রিক্যাল এন্ড ইলেক্ট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৩-১৪ শিক্ষাবর্ষের ইমাম আল নাসের, একই বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মো. সোহাইল সাবিত সৌমিক এবং আবু হায়াত মো. জুলফিকার বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিটের নেতা। বাকি ১২ জন হলেন, বাংলা বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মো. খলিলুর রহমান, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৬-৭ শিক্ষাবর্ষের মো. পারভেজ, গণিত বিভাগের ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষের আব্দুল মোতালেব হোসেন খোকন, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০১৪-১৫ শিক্ষাবর্ষের মো. রোমান মিয়া, ফিনান্স বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের আসমা আফিয়া সেতু, একাউন্টিং এন্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের মো. তানভীর হাসান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৫-০৬ শিক্ষাবর্ষের এডিএম মারুফ বিল্লাহ, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ২০১০-১১ শিক্ষাবর্ষের তানভীর আহমেদ, মৃত্তিকা, পানি ও পরিবেশ বিভাগের ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষের মো. হাবিবুর রহমান, ফলিত রসায়ন ও কেমিকৌশল বিভাগের ২০০৭-০৮ শিক্ষাবর্ষের শেখ সাদ্দাম হোসাইন, ইলেকট্রিকাল এন্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২০১৬-১৭ শিক্ষাবর্ষের তানঈম আকন্দ এবং মো. ওমর ফারুক।

-বেলাল হোসেন