চট্টগ্রাম বন্দরে সাম্প্রতিক অচলাবস্থায় ব্যবসায়ীরা গভীর উদ্বেগের মধ্যে রয়েছেন। বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড কে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শ্রমিক-কর্মচারীদের টানা কর্মবিরতির ফলে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
ঢাকার ট্যাড সোর্সিং লিমিটেড নামের বায়িং হাউসের ১২০ কনটেইনার তৈরি পোশাক চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। গত সপ্তাহে বন্দরের কর্মচারীদের কর্মবিরতির কারণে এসব পণ্য জাহাজে ওঠেনি। ফলে সিঙ্গাপুর বন্দরের নির্ধারিত বড় জাহাজ বা মাদার ভেসেল ধরতে পারেনি এ বিপুল পরিমাণ পণ্য।
ট্যাড সোর্সিংয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আশিকুর রহমান বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আটকে থাকা কনটেইনারে জার্মানির দুটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের তৈরি পোশাক রয়েছে। দু–এক দিনের মধ্যে পরিস্থিতির উন্নতি না হলে আমাদের বিপদে পড়তে হবে। ক্রেতা প্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছেন। বন্দরে পণ্য পড়ে থাকায় তাঁরা (ক্রেতারা) উদ্বিগ্ন।’
ট্যাড সোর্সিংয়ের মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানিকারক অনেক প্রতিষ্ঠানই চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাদের কারও রপ্তানি পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। আবার অনেকের আমদানি পণ্য ও কাঁচামাল খালাস হচ্ছে না। তাতে কারখানার উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে পণ্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে, এমনটাই বলেছেন উদ্যোক্তারা।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপিওয়ার্ল্ডের কাছে ইজারা দেওয়ার সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের ব্যানারে এ কর্মবিরতি চলছে। গত শনিবার থেকে তিন দিন আট ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালনের পর মঙ্গলবার থেকে আন্দোলনকারীরা লাগাতার কর্মবিরতি শুরু করেন। এতে বন্দর কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। গতকাল বিকেলে বন্দর ভবনে নৌপরিবহন উপদেষ্টা এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে বৈঠকের পর দুই দিন কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীর।
গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাবে দেশের মোট রপ্তানির ৯১ শতাংশই হয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে। অথচ পাঁচ দিন ধরে বন্দরের কার্যক্রম ব্যাহত হলেও অচলাবস্থা নিরসনে সরকারের কোনো সংস্থার দৃশ্যমান উদ্যোগ দেখা যায়নি। গতকাল আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বৈঠক করেন নৌপরিবহন উপদেষ্টা। তাঁর কাছে চার দফা দাবি তুলে ধরেন আন্দোলনকারীরা। দুই দিনের মধ্যে দাবি বাস্তবায়িত না হলে আবার কর্মবিরতির হুমকি দিয়েছেন তাঁরা।
কনটেইনার ডিপো সমিতির হিসাবে, আন্দোলন শুরুর আগে ১৯টি বেসরকারি ডিপোতে রপ্তানির অপেক্ষায় ছিল প্রায় আট হাজার একক কনটেইনার। গতকাল বিকেলে কর্মসূচি প্রত্যাহারের আগপর্যন্ত সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১১ হাজারে।
জানতে চাইলে বেসরকারি কনটেইনার ডিপো সমিতির মহাসচিব রুহুল আমিন সিকদার বলেন, কর্মসূচি স্থগিতের পর বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে রপ্তানি কনটেইনার বন্দরে নেওয়া শুরু হয়। নতুন করে কর্মবিরতি না হলেও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে।
চট্টগ্রাম বন্দরের অচলাবস্থার কারণে দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের ৮০০ শতাধিক কনটেইনারে কাঁচামাল আটকে আছে। তাতে পণ্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ ছাড়া রপ্তানি পণ্যের ২৫০ কনটেইনার ডিপোতে পড়ে আছে। রপ্তানি পণ্যের মধ্যে খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যও রয়েছে।
এসব তথ্য দিয়ে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল বলেন, ‘বন্দরে কাঁচামাল আটকে থাকায় প্লাস্টিক, ইলেকট্রনিকসহ বিভিন্ন পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাদ্যপণ্য সময়মতো জাহাজে না উঠলে বিদেশি ক্রেতারা রপ্তানি পণ্য গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানাতে পারেন। ফলে আমরা খুবই জটিল পরিস্থিতির মুখে আছি। আমরা চাই, দ্রুত সমস্যার সমাধান হোক।’
সাভারের এন আর ক্রিয়েশনসের তিন লাখ মার্কিন ডলার সমমূল্যের পাঁচ ট্রাক তৈরি পোশাক দুই দিন অপেক্ষার পর চট্টগ্রামের বেসরকারি ডিপোতে হস্তান্তর করতে পেরেছে। তবে আমদানি-রপ্তানি বন্ধ থাকায় সেই পণ্য জাহাজে ওঠেনি।
প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এলকাস মিয়া বলেন, এমনিতেই ক্রয়াদেশ অনেক কম। তার ওপর বন্দরের অচলাবস্থার জন্য লোকসান গুনতে হলে সেটি হবে ভয়াবহ। ইতিমধ্যে ডিপোর বাইরে দুই দিন দাঁড়িয়ে থাকায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ গুনতে হয়েছে।
তৈরি পোশাকশিল্পের আরেক প্রতিষ্ঠান স্প্যারো গ্রুপের দেড় লাখ তৈরি পোশাক চট্টগ্রাম বন্দরে পড়ে আছে। ৯ ফেব্রুয়ারির মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির আরও ৯ লাখ পোশাক যাবে বন্দরে। ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যাবে আরও ১৪ লাখ তৈরি পোশাক। এসব তৈরি পোশাকের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র।
এসব তথ্য দিয়ে স্প্যারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে মার্চের মাঝামাঝি সময় আমাদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের গ্রীষ্মের শুরুর দিকের তৈরি পোশাক জাহাজীকরণ করা হয়। আমাদের মোট পোশাক রপ্তানি বড় অংশই গ্রীষ্ম মৌসুমের। ফলে এখন পণ্য রপ্তানি যাতে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটি খেয়াল রাখতে হবে।’
কর্মবিরতির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ চলাচল বন্ধ হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ১০ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতারা। তাঁরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেছেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ও অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এ মুহূর্তে বিষয়টি সুরাহা করা জরুরি।
গতকাল বিকেলে বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশন (বিইএফ), মেট্রো চেম্বার, ঢাকা চেম্বার, বিসিআই, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ, বিজিবিএ, বিজিএপিএমইএ ও বিটিটিএলএমইএ এই যৌথ বিবৃতি দেয়। এর আগে রাজধানীর গুলশানে বিটিএমএর কার্যালয়ে জরুরি বৈঠক হয়। যদিও বৈঠকে সব সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন না। বৈঠক শেষে বিইএফের সভাপতি ফজলে শামীম এহসান, বিজিএমইএর ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম রহমান, ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদ সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
যৌথ বিবৃতিতে আন্দোলনরত শ্রমিক ইউনিয়নের উদ্দেশে ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, ‘আপনাদের দাবিদাওয়া সরকারের কাছে পৌঁছানোর অধিকার আপনাদের আছে। তবে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া মানে নিজের ঘরকে নিজেই বিপদে ফেলা। আমরা আপনাদের প্রতি আহ্বান জানাই, দেশের অর্থনীতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকে এই ব্যতিক্রমী অবস্থান থেকে সরে আসুন।’
-মামুন










