‘আমাদের আবার গড়ে তুলতে হবে’: মোজাম্বিকের বন্যাদুর্গত মানুষ

ছবিঃ সংগৃহীত

মোজাম্বিকের গাজা প্রদেশের চোকওয়ে শহরের বাসিন্দা ৩০ বছর বয়সী এমিলিয়া মাশেল ও তাঁর তিন সন্তান ১৭ জানুয়ারি বিকেলে যখন বাস্তুচ্যুত মানুষের আশ্রয়কেন্দ্র চিয়াকুয়েলানে ছুটে যান, তখন তাঁদের শহরের বড় একটি অংশ ইতোমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে।খবর আলজাজিরার।

দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে উৎপত্তি হয়ে মোজাম্বিকের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত লিম্পোপো নদীর পানি ভয়াবহ মাত্রায় বেড়ে যায়। ডিসেম্বরের শেষ দিক থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে টানা ভারী বৃষ্টির ফলেই এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। “আমরা জানতাম বন্যা হবে,” বলেন মাশেল। “টেলিভিশনে দেখেছিলাম বন্যার সতর্কতা দেওয়া হচ্ছে।”

টমেটো ও পেঁয়াজ বিক্রি করে পরিবার চালানো মাশেল প্রথমবার চিয়াকুয়েলানে আসেন মাত্র চার বছর বয়সে, ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যার সময়। সেই বন্যা ছিল মোজাম্বিকের ইতিহাসের অন্যতম প্রাণঘাতী দুর্যোগ।
“২০০০ সালে এখানে এসেছিলাম, আবার ২০১৩ সালেও। তাই এবারও এসেছি-এটি তুলনামূলক নিরাপদ জায়গা,” বলেন তিনি। এ মৌসুমে অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি উপচে পড়ায় সৃষ্ট বন্যাকে কর্তৃপক্ষ কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ বলে উল্লেখ করেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫০ জনের বেশি মানুষ এবং দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে প্রায় ৮ লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

যদিও বৃষ্টি কিছুটা কমেছে এবং নদীর পানি নামতে শুরু করেছে, তবুও এখনো বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে ডুবে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ত্রাণকর্মীরা। ইউনিসেফের যোগাযোগ প্রধান গাই টেইলর বলেন, “কিছু জায়গায় ওপর দিয়ে উড়লে মনে হয় যেন সমুদ্রের ওপর দিয়ে যাচ্ছি-দূরদূরান্ত পর্যন্ত শুধু পানি আর পানির মাঝে বিচ্ছিন্ন ঘরবাড়ি।”

মোজাম্বিকের আবহাওয়া সংস্থা আইএনএএম জানিয়েছে, উত্তরাঞ্চলের প্রদেশগুলোতে মাঝারি বৃষ্টি অব্যাহত থাকতে পারে। সরকারের হিসাব অনুযায়ী, ধ্বংস হওয়া অবকাঠামোর কারণে শত শত মিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। কিছু এলাকায় মানুষ এখনো আটকে আছেন এবং উদ্ধার প্রয়োজন।

গাজা প্রদেশের রাজধানী শহর জাই-জাইয়ের ব্যবসায়ী পাউলা ফনসেকা বলেন, প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা কঠিন। তাঁর রেস্তোরাঁ ভবন এখনো পানির নিচে। মোজাম্বিকের অন্যতম কৃষিপ্রধান অঞ্চল এই গাজা প্রদেশ। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে শত শত হেক্টর চাষযোগ্য জমি ও খাদ্য সংরক্ষণাগার ভেসে গেছে।

মাপুতো প্রদেশের মাতোলা পৌরসভা-যা দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহর-সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ নগর বন্যার মুখে পড়েছে বলে জানিয়েছেন মেয়র জুলিও পারুকুয়ে। অপরিকল্পিত নির্মাণ ও পানি নিষ্কাশন পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হাজার হাজার পরিবারকে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে হয়েছে। রাজধানী মাপুতোতেও এখনো অনেক এলাকা অচল এবং বহু ঘরবাড়ি পানির নিচে।

 অনেক বেশি পানি

 নিজের ঘরে দ্রুত পানি ঢুকতে দেখে মাশেল প্রয়োজনীয় কাপড় ও সামগ্রী নিয়ে সন্তানদের নিয়ে পাশের এক প্রতিবেশীর পাকা বাড়িতে আশ্রয় নেন। বাড়ির ছাদে কিছু জিনিস রাখেন। “আমাদের পাড়ার সব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০১৩ সালের তুলনায় এবারের বন্যা অনেক বেশি ভয়ংকর,” বলেন তিনি।
“পানি ছিল অস্বাভাবিকভাবে বেশি।”

২০১৩ সালেও লিম্পোপো নদীর পানি উপচে চোকওয়ে প্লাবিত হয়েছিল, যা তাঁকে ২০০০ সালের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়।“এভাবে বৃষ্টি হলেই বারবার চিয়াকুয়েলানে যেতে হওয়াটা খুবই যন্ত্রণাদায়ক,” বলেন মাশেল। এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি এবারের বন্যাই কি মোজাম্বিকের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়াবহ। তবে তথ্য বলছে, কিছু দিক থেকে এটি ১৯৭৭ ও ২০০০ সালের বন্যাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। ২০২৫–২০২৬ বর্ষা মৌসুমের আগে থেকেই আইএনএএম ভারী বৃষ্টির সতর্কতা দিয়েছিল। ২০১৯ সালে ঘূর্ণিঝড় ইদাইয়ে অন্তত ১,৫০০ মানুষের মৃত্যুর পর মোজাম্বিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থায় উন্নতি আনে-রাডার, স্যাটেলাইট ছবি, স্থানীয় রেডিওতে সতর্কবার্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় বাড়ানো হয়। তবে সমালোচকদের মতে, শুধু সতর্কতা দিলেই যথেষ্ট নয়। অবসরপ্রাপ্ত জলবিদ কার্মো ভাজ বলেন, “সরকারকে মানুষকে আগেভাগে সরিয়ে নেওয়া এবং আশ্রয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।”

 কিছুই করার থাকে না 

মাশেল বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার পরই তিনি ঘর ছাড়েন।
“সব কিছু নিয়ে বের হওয়া সম্ভব হয়নি,” আক্ষেপ তাঁর। জাই-জাই শহরে অনেক মানুষ শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন-লুটপাটের ভয় বা কোথায় যাবেন না জানার কারণে, বলেন ফনসেকা। “এক সময় বুঝতে হয়-এখন চলে যাওয়া ছাড়া আর কিছু করার নেই।”

মাতোলার মেয়র স্বীকার করেন, সবাইকে সহায়তা দেওয়া সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
“আমরা আমাদের সাধ্যের মধ্যে সহায়তা করছি এবং অংশীদারদের সঙ্গে কাজ করছি,” বলেন তিনি। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো জানিয়েছে, এত বড় সংকট মোকাবিলার মতো পর্যাপ্ত সম্পদ তাদের নেই। এর মধ্যেই উত্তর মোজাম্বিকে আইএসআইএল-সমর্থিত বিদ্রোহে লক্ষাধিক মানুষ বাস্তুচ্যুত।

তবু অনেক জায়গায় সাধারণ মানুষই এগিয়ে আসছেন। “যাদের সামান্য আছে, তারাও অন্যদের সাহায্য করছে,” বলেন ফনসেকা। আঞ্চলিক দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ উদ্ধারকারী দল, খাদ্য ও আশ্রয় সামগ্রী পাঠিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে চরম দুর্যোগে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি মোজাম্বিক। সরকার জানিয়েছে, ২০৩০ সাল পর্যন্ত জলবায়ু অভিযোজন প্রকল্পে তাদের ৩০ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ প্রয়োজন।

  আবার গড়ে তুলে ফিরে যেতে হবে 

চিয়াকুয়েলানে আশ্রয়কেন্দ্রের জীবন খুব কষ্টকর বলে জানান মাশেল। “সহায়তা পর্যাপ্ত নয়। আমরা মাদুরে ঘুমাই এবং খাবারের জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল।” কেন্দ্রটি সকালে খিচুড়ি এবং বিকেলে ভাত-ডাল দেয়। তৃতীয় বেলা খাবার খুব কমই পাওয়া যায়। ইউনিসেফের টেইলর বলেন, বাস্তুচ্যুতদের অর্ধেকই শিশু-এবং তাদের খাবার ও পানিবাহিত রোগ নিয়ে উদ্বেগ খুব বেশি।

“মোজাম্বিকে আগেই প্রতি ১০ জন শিশুর মধ্যে ৪ জন দীর্ঘমেয়াদি অপুষ্টিতে ভুগছিল। অপুষ্ট শিশুর জন্য ডায়রিয়াও প্রাণঘাতী হতে পারে,” বলেন তিনি। প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে আশ্রয়কেন্দ্রে অপেক্ষা করছেন মাশেল। তাঁর স্বামী গাজা প্রদেশের অন্য একটি প্লাবিত এলাকায় আটকে আছেন। নিজের ঘর ও ব্যবসা ভেসে গেলেও তিনি ফিরতে চান।“যা হচ্ছে তা খুব দুঃখজনক,” বলেন মাশেল। “তবু আমাদের আবার গড়ে তুলতে হবে-নিজের ঘরে ফেরার জন্য।”

-বেলাল হোসেন