দক্ষিণ সুদানে বিমান হামলায় আক্রান্ত হাসপাতাল

“ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর একজন চিকিৎসাকর্মী দক্ষিণ সুদানের জংলাই প্রদেশের ওল্ড ফাংগাক এলাকায় একটি ক্লিনিকে অপুষ্টিতে ভোগা এক শিশুকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। ছবিটি তোলা হয় ১৮ আগস্ট ২০১৭।” (আলবার্ট গনজালেজ ফারান/এএফপি)

দক্ষিণ সুদানে সরকারপন্থি বাহিনীর বিমান হামলায় আন্তর্জাতিক চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ)-এর একটি হাসপাতাল আক্রান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিরোধী নিয়ন্ত্রিত এলাকায় সেনাবাহিনী ও বিরোধী জোটের মধ্যে নতুন করে সংঘর্ষ শুরুর প্রেক্ষাপটে এই হামলার ঘটনা ঘটল। খবর আলজাজিরার।

এমএসএফ জানায়, মঙ্গলবার রাতে জংলাই প্রদেশের লানকিয়েন শহরে অবস্থিত তাদের হাসপাতাল লক্ষ্য করে এই বিমান হামলা চালানো হয়। গত ১২ মাসে দেশটিতে এমএসএফ পরিচালিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এটি দশম হামলার ঘটনা। এর আগে, গত ডিসেম্বর মাসে দক্ষিণ সুদান সরকার জংলাই প্রদেশের বিরোধী নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে মানবিক সহায়তার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করে। এর ফলে এমএসএফের পক্ষে সেখানে জরুরি চিকিৎসা সহায়তা পৌঁছে দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। এমএসএফ এক বিবৃতিতে জানায়, হামলার কয়েক ঘণ্টা আগেই সম্ভাব্য আক্রমণের তথ্য পাওয়ার পর হাসপাতালটি খালি করে রোগীদের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। তবে হামলায় এমএসএফের একজন কর্মী সামান্য আহত হয়েছেন বলে জানানো হয়। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, `হামলায় হাসপাতালের প্রধান গুদাম ধ্বংস হয়ে গেছে এবং চিকিৎসাসেবা দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ সরঞ্জাম আমরা হারিয়েছি।’

একই দিনে পৃথক আরেক ঘটনায় জংলাই প্রদেশের পিয়েরি এলাকায় এমএসএফের একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র অজ্ঞাত হামলাকারীদের দ্বারা লুটপাটের শিকার হয়। এর ফলে কেন্দ্রটি স্থানীয় জনগণের জন্য সম্পূর্ণভাবে ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। সংস্থাটি জানায়, লানকিয়েন ও পিয়েরিতে কর্মরত আমাদের সহকর্মীরা স্থানীয় জনগণের সঙ্গে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের বর্তমান অবস্থান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি।' দক্ষিণ সুদানে এমএসএফের কার্যক্রম ব্যবস্থাপক গুল বাদশাহ বলেন, “আমরা আমাদের সব স্থাপনার জিপিএস অবস্থান আগেই সরকার ও সংঘাতে জড়িত সব পক্ষকে জানিয়েছিলাম এবং তারা যে এসব অবস্থান সম্পর্কে অবগত-সে বিষয়ে নিশ্চিতকরণও পেয়েছিলাম।' তিনি আরও বলেন, দক্ষিণ সুদানে একমাত্র সরকারি সশস্ত্র বাহিনীরই বিমান হামলা চালানোর সক্ষমতা রয়েছে।’

সরকারি মুখপাত্র আতেনি ওয়েক আতেনি এবং সেনাবাহিনীর মুখপাত্র মেজর জেনারেল লুল রুয়াই কোয়াং এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে গণমাধ্যমের প্রশ্নে কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি।

দেশে অত্যন্ত ভয়াবহ মানবিক চাহিদা 

বিশ্লেষকদের মতে, জংলাই প্রদেশ দক্ষিণ সুদানের সবচেয়ে ভয়াবহ খাদ্য সংকট ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে থাকা অঞ্চলগুলোর একটি। জাতিসংঘ জানিয়েছে, গত ডিসেম্বর থেকে চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত সংঘর্ষ ও বিমান হামলার কারণে জংলাই প্রদেশে আনুমানিক ২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। এমএসএফ জানায়, লানকিয়েন ও পিয়েরি এলাকায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের জন্য তারাই একমাত্র স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারী সংস্থা। ফলে এসব স্থাপনায় হামলার অর্থ হলো-স্থানীয় জনগণ পুরোপুরি চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়বে।

গুল বাদশাহ বলেন, `আমাদের কর্মী ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে আমরা বাধ্য হব।’ তিনি বলেন, `দেশজুড়ে মানুষের প্রয়োজন যে অত্যন্ত ভয়াবহ—তা আমরা জানি। কিন্তু আমাদের লক্ষ্য করে হামলা চালানো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’ এমএসএফ জানায়, তারা বর্তমান দক্ষিণ সুদানের ভূখণ্ডে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কাজ করে আসছে। সংস্থাটির মতে, লক্ষ্যভিত্তিক হামলার কারণে গ্রেটার আপার নাইল অঞ্চলে দুটি হাসপাতাল বন্ধ করতে হয়েছে এবং জংলাই, আপার নাইল ও সেন্ট্রাল ইকুয়েটোরিয়া প্রদেশে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়েছে। ২০১১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকেই বিশ্বের নবীনতম রাষ্ট্র দক্ষিণ সুদান গৃহযুদ্ধ, দারিদ্র্য এবং ব্যাপক দুর্নীতিতে জর্জরিত।

-বেলাল হোসেন