বিক্ষোভে নিহতদের তালিকা প্রকাশের পর ইরান সরকারের বিরুদ্ধে প্রশ্ন

ছবিঃ সংগৃহীত

সাম্প্রতিক দেশজুড়ে চলা বিক্ষোভে নিহত হাজারো মানুষের একটি তালিকা প্রকাশের পর ইরান সরকার নিখোঁজ বা বাদ পড়া নাম জানানোর জন্য একটি অনলাইন পোর্টাল চালু করেছে। বিক্ষোভে নিহতদের পরিচয় নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও জবাবদিহির দাবি ওঠার প্রেক্ষাপটে এই উদ্যোগ নেওয়া হলো।খবর আলজাজিরার।

কর্তৃপক্ষের দাবি, গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া সরকারবিরোধী বিক্ষোভে মোট ৩ হাজার ১১৭ জন নিহত হয়েছেন। তবে তারা জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে, যেখানে বলা হয়েছে-নিহতদের বেশির ভাগই রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। কর্তৃপক্ষের মতে, বেশির ভাগ হত্যাকাণ্ড ঘটে ৮ ও ৯ জানুয়ারি। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস অ্যাকটিভিস্টস নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, তারা ৬ হাজার ৮৭২টি মৃত্যুর ঘটনা যাচাই করেছে এবং আরও ১১ হাজারের বেশি মামলার তদন্ত চলছে। জাতিসংঘের এক বিশেষ প্রতিবেদক বলেছেন, রাষ্ট্রীয় ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের মধ্যেও ধীরে ধীরে তথ্য বেরিয়ে আসায় প্রকৃত মৃত্যুসংখ্যা ২০ হাজার ছাড়িয়ে যেতে পারে।

রোববার প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সরকার ২ হাজার ৯৮৬ জন নিহতের নাম প্রকাশ করে। সরকার জানায়, বাকি ১৩১ জনের পরিচয় নিশ্চিত করা যায়নি; তাই পরবর্তীতে একটি পরিপূরক তালিকা প্রকাশ করা হবে, যদিও এর সময়সূচি জানানো হয়নি। প্রকাশিত তালিকায় নিহতদের পূর্ণ নাম, তাঁদের পিতার প্রথম নাম এবং ১০ সংখ্যার জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বরের শেষ ছয়টি সংখ্যা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে কোথায়, কখন, কীভাবে এবং কার হাতে তাঁরা নিহত হয়েছেন-সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বিক্ষোভকারী ও রাষ্ট্রীয় সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মধ্যে কোনো পার্থক্যও করা হয়নি। তালিকা প্রকাশের পর থেকেই বহু ইরানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করছেন, নিহত অনেকের নাম এতে বাদ পড়েছে যাদের মৃত্যুর বিষয়টি পরিবার ও স্বজনরা নিশ্চিত করেছেন। তালিকায় একই নাম ও জাতীয় পরিচয় নম্বরসহ একাধিক পুনরাবৃত্ত এন্ট্রিও পাওয়া গেছে।

মঙ্গলবার রাতে সরকার একটি ওয়েবসাইট চালুর ঘোষণা দেয়, যেখানে মানুষ তালিকায় বাদ পড়া স্বজনদের নাম জানাতে পারবেন। তবে কবে নাগাদ তালিকা হালনাগাদ হবে বা ভুল-অস্পষ্টতা সংশোধন করা হবে-সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানানো হয়নি। এ ছাড়া নিহতদের মরদেহ হস্তান্তরের জন্য অর্থ দাবি করা, কিংবা আহত বিক্ষোভকারীদের জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর মতো অভিযোগও জানাতে জনগণকে উৎসাহিত করা হয়েছে। সরকার ধারাবাহিকভাবে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে সব ধরনের অসদাচরণের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে—এর মধ্যে হাসপাতাল তল্লাশি ও বিক্ষোভকারীদের সহায়তাকারী চিকিৎসাকর্মীদের গ্রেপ্তারের অভিযোগও রয়েছে।

জাতিসংঘের তদন্ত ম্যান্ডেট প্রত্যাখ্যান করে সরকার একটি অভ্যন্তরীণ তদন্ত কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে। তবে কমিটির সদস্য কারা, বা কবে তদন্তের ফল প্রকাশ করা হবে-সে বিষয়ে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। রোববার এক বিবৃতিতে সরকার জানায়, “সাম্প্রতিক অস্থিরতা ও ঘটনায় নিহত সবাই এই দেশের সন্তান। কোনো শোকাহত মানুষকে নীরবতা ও অসহায়ত্বে ফেলে রাখা উচিত নয়।” এটিকে নিহতদের পরিবার ও শোকাহত জনগণকে শান্ত করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে এই বক্তব্যের সঙ্গে সরকারের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় কর্তৃপক্ষের প্রতিদিনের মন্তব্যের স্পষ্ট বৈপরীত্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানসহ শীর্ষ কর্মকর্তারা বারবার দাবি করে আসছেন, এসব ‘দাঙ্গার’ পেছনে ‘সন্ত্রাসীরা’ রয়েছে, যাদের যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল অর্থ ও অস্ত্র দিয়ে সহায়তা করেছে। এদিকে জানুয়ারির শেষ দিকে ইরানের শহীদ ফাউন্ডেশন জানায়, নিহত ২ হাজার ৪২৭ জন ছিলেন ‘নির্দোষ’-যার মধ্যে বেসামরিক নাগরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা রয়েছেন। এর অর্থ দাঁড়ায়, বাকি ৬৯০ জনকে সম্ভবত সরকার ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করেছে, যদিও এ বিষয়ে আর কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

নিহতদের নামের তালিকাটি দুইটি পত্রিকার প্রথম পাতায় ছোট হরফে পুরোপুরি ছাপা হয়। দৈনিক পায়াম-ই মা পত্রিকা শিরোনাম দেয়-“মৃত ব্যক্তিরা”। মঙ্গলবার সরকারের মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি এক সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। সেখানে এক সাংবাদিকের তীব্র প্রশ্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। হাম-মিহান পত্রিকার সাংবাদিক পারিসা হাসেমি-যে পত্রিকাটি বর্তমানে বিক্ষোভ সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে আইনি চাপে রয়েছে-মুখপাত্রকে স্মরণ করিয়ে দেন যে ইরান দুর্নীতি, দারিদ্র্য, জ্বালানি ও পানি সংকট, দীর্ঘস্থায়ী বায়ুদূষণসহ বহু সংকটে জর্জরিত।

তিনি বলেন, “এখন শোনা যাচ্ছে, ‘শত্রু’ আমাদের দেশে বিক্ষোভ নাশকতা করেছে, রক্তের নদী বইয়ে দিয়েছে এবং গণহত্যা চালিয়েছে। কিন্তু যারা আমাদের তরুণ, শিশু, নারী ও পুরুষদের লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে—তারাই যে এই দেশের শত্রু, এতে কোনো সন্দেহ নেই।” তিনি উল্লেখ করেন, ঘটনার পর একজন কর্মকর্তাও পদত্যাগ করেননি। “এটা যদি অন্য কোনো দেশে ঘটত, তাহলে সেখানকার কর্মকর্তারা হয় লজ্জায় মারা যেতেন, না হয় সম্মানের খাতিরে আত্মহত্যা করতেন,” বলেন হাসেমি। জবাবে মোহাজেরানি মৃদু হেসে বলেন, সাংবাদিক প্রশ্ন না করে বক্তব্য দিচ্ছেন এবং তিনি আবারও ‘আশা’ যে কোনো সমাজের জন্য জরুরি—এই বক্তব্য পুনরাবৃত্তি করেন।

রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা তাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ভিডিও থেকে সাংবাদিকের প্রায় তিন মিনিটের বক্তব্য বাদ দেয়।এদিকে খ্যাতিমান অভিনেত্রী এলনাজ শাকেরদুস্ত সোমবার এক হাতে লেখা বিবৃতিতে—যেটি রক্তমাখা বলে মনে হয়েছে-ঘোষণা দেন যে তিনি ইরানি চলচ্চিত্র জগত ছাড়ছেন।

তিনি লেখেন, “যে মাটিতে রক্তের গন্ধ, সেখানে আমি আর কোনো চরিত্রে অভিনয় করব না। এটিই আমার প্রধান ভূমিকা।” একই সঙ্গে তিনি ফজর আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব বয়কটের ঘোষণা দেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত উৎসবটি এ সপ্তাহে শুরু হলেও বহু শিল্পী ও সাধারণ মানুষ এতে অংশ নেননি। তবে অংশগ্রহণকারী কয়েকজন পরিচালক ও অভিনেতা বয়কটকারীদের কড়া ভাষায় সমালোচনা করেছেন। পরিচালক ও চিত্রনাট্যকার মোহাম্মদ হোসেইন মাহদাভিয়ান অনলাইনে সমালোচনার মুখে পড়েন, যখন তিনি বয়কটকারীদের ‘কাপুরুষ’ বলে অভিহিত করেন এবং বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে নির্মিত তাঁর চলচ্চিত্রে “ভীত তারকাদের” না নেওয়ায় তিনি খুশি।

-বেলাল হোসেন