ভেনেজুয়েলার তেলসম্পদই মাদুরোর কাল হলো

চর্যাপদের সেই বিখ্যাত উক্তি—‘আপনা মাঁসে হরিণা বৈরী’, অর্থাৎ নিজের মাংসের কারণেই হরিণ নিজের শত্রু। বর্তমানে লাতিন আমেরিকার দেশ ভেনেজুয়েলার করুণ পরিস্থিতির দিকে তাকালে এই পঙক্তিটিই বারবার মনে পড়ে। দেশটিতে অতর্কিত সামরিক হামলা চালিয়ে প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে সস্ত্রীক যুক্তরাষ্ট্রে তুলে নিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি কেবল ‘মাদক পাচার’ বা ‘গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার’-এর মোড়কে ঢাকা কোনো সাধারণ অভিযান নয়; বরং এর নেপথ্যে রয়েছে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের নগ্ন ‘সম্পদ সাম্রাজ্যবাদ’।

ভেনেজুয়েলার মূল অপরাধ বা তার ‘মাংস’ হলো দেশটির মাটির নিচে থাকা বিশাল তেলের সাগর। বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘অয়েল অ্যান্ড গ্যাস জার্নাল’-এর ২০২৩ সালের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বড় প্রমাণিত অপরিশোধিত তেলের মজুত রয়েছে ভেনেজুয়েলায়। দেশটির মজুত তেলের পরিমাণ প্রায় ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল।

বিশ্বের শীর্ষ তেল মজুতকারী দেশগুলোর একটি তুলনামূলক চিত্র:

দেশ তেলের মজুত (বিলিয়ন ব্যারেল)
ভেনেজুয়েলা ৩০৩
সৌদি আরব ২৬৭
ইরান ২০৮
কানাডা ১৬৩
ইরাক ১৪৫
যুক্তরাষ্ট্র ৫৫

তালিকায় দেখা যাচ্ছে, তেলের মজুতের দিক থেকে ভেনেজুয়েলা এমনকি সৌদি আরব বা ইরানকেও পেছনে ফেলে দিয়েছে। অথচ ভূ-রাজনৈতিকভাবে ওয়াশিংটনের প্রতি চরম শত্রুভাবাপন্ন এই দেশটিকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য দীর্ঘদিনের মাথাব্যথার কারণ।

বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্প প্রশাসনের লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—কারাকাসে এমন একটি সরকার বসানো যারা হবে হোয়াইট হাউসের একান্ত অনুগত বা ‘পুতুল সরকার’। এর পেছনে প্রধানত তিনটি কারণ কাজ করছে:

১. জ্বালানি নিরাপত্তা: ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির অন্যতম ভিত্তি হলো সস্তা জ্বালানি। ভেনেজুয়েলার তেল সরাসরি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে এলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম নিজেদের ইচ্ছামতো নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে ওয়াশিংটন।

২. বাজার নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে ভেনেজুয়েলার তেল বাণিজ্যে রাশিয়া ও চীনের বড় প্রভাব রয়েছে। মাদুরোকে সরিয়ে সেখানে নিজেদের লোক বসাতে পারলে মস্কো ও বেইজিংকে লাতিন আমেরিকা থেকে বিতাড়িত করা সহজ হবে।

৩. যুদ্ধের ব্যাকআপ: ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধের পরিস্থিতিতে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে তেলের যে সংকট তৈরি হবে, ভেনেজুয়েলার তেল দিয়ে তা অনায়াসেই সামাল দেওয়া সম্ভব।

মাদুরোকে মাদক চক্রের নেতা হিসেবে অভিযুক্ত করা হলেও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, এটি আসলে সম্পদ দখলের একটি অজুহাত মাত্র। ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য—‘দেশটি যেন সঠিকভাবে পরিচালিত হয়, তা আমরা নিশ্চিত করব’—আসলে সার্বভৌম একটি দেশের ওপর সরাসরি খবরদারি করারই নামান্তর।

হরিণ যেমন তার সুন্দর মাংসের জন্য শিকারির লক্ষ্যবস্তু হয়, ভেনেজুয়েলাও তেমনি তার কালো সোনার (তেল) জন্য আজ পরাশক্তির আগ্রাসনের শিকার। মাদুরোকে তুলে নেওয়ার মাধ্যমে ওয়াশিংটন কি তবে লাতিন আমেরিকায় নতুন এক উপনিবেশবাদের সূচনা করল? এই প্রশ্ন এখন বিশ্ববিবেকের কাছে।

-এম. এইচ. মামুন