রাফাহ সীমান্ত দিয়ে রোগী সরিয়ে নেওয়া স্থগিত করল ইসরাইল: রেড ক্রিসেন্ট

ছবিঃ সংগৃহীত

গাজার রাফাহ সীমান্ত দিয়ে ফিলিস্তিনি রোগী ও আহতদের সরিয়ে নেওয়ার কার্যক্রম আজকের জন্য স্থগিত করেছে ইসরাইল। ফিলিস্তিনি রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (পিআরসিএস)–এর একজন মুখপাত্র বুধবার এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।খবর আলজাজিরার।

গাজা উপত্যকার খান ইউনিস থেকে আল জাজিরাকে পিআরসিএস মুখপাত্র রায়েদ আল-নিমস বলেন,“দুঃখজনকভাবে, কিছুক্ষণ আগে আমাদের জানানো হয়েছে যে আজকের রোগী সরিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া বাতিল করা হয়েছে। ”তিনি জানান, পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা অনুযায়ী গুরুতর অসুস্থ ও আহত ব্যক্তিদের প্রথমে রেড ক্রিসেন্টের হাসপাতালে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হতো। এরপর অ্যাম্বুলেন্সে করে তাদের রাফাহ সীমান্তে নিয়ে যাওয়া এবং সেখান থেকে মিসর কিংবা অন্যান্য দেশের হাসপাতালে পাঠানোর কথা ছিল।

তবে বাস্তবে সীমান্ত দিয়ে খুব অল্পসংখ্যক মানুষকে যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। সোমবার মাত্র পাঁচজন এবং মঙ্গলবার ১৬ জন ফিলিস্তিনি মিসরে যেতে পেরেছেন-যা ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ঘোষিত দৈনিক ৫০ জন অনুমতির তুলনায় অনেক কম।

দীর্ঘ বিলম্বের পর ইসরাইল গাজার একমাত্র বহির্বিশ্ব সংযোগকারী সীমান্ত রাফাহ খুলতে সম্মত হলেও মানুষের চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। কেবলমাত্র সেই ফিলিস্তিনিরাই গাজায় ফিরতে পারছেন, যারা যুদ্ধের সময় অঞ্চলটি ছেড়েছিলেন এবং ইসরাইলি নিরাপত্তা যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ফিরে আসা অনেক ফিলিস্তিনি অভিযোগ করেছেন, যাত্রাপথে তাদের চোখ বেঁধে রাখা, হাতকড়া পরানো, জিজ্ঞাসাবাদ এবং যৌন হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বর্তমানে ১৮ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি রোগী রাফাহ সীমান্ত দিয়ে চিকিৎসার জন্য সরিয়ে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ৪৪০ জনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, যাদের অবিলম্বে উন্নত চিকিৎসা প্রয়োজন। আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম জানান, কেন কিছু ফিলিস্তিনিকে গাজা ছাড়তে বা ফিরে আসতে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না-সে বিষয়ে ইসরাইল কোনো ব্যাখ্যা দিচ্ছে না।

সহিংসতা বেড়েছে গাজায় 

রাফাহ সীমান্তে বিধিনিষেধ আরোপের মধ্যেই গাজাজুড়ে নতুন করে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১০ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে একাধিক শিশু রয়েছে বলে চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে।

আল জাজিরার মাঠপর্যায়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা শহরের বিভিন্ন এলাকায় গোলাবর্ষণে সাতজন নিহত হয়েছেন। এর মধ্যে তুফাহ এলাকায় চারজন এবং জেইতুন এলাকায় তিনজন নিহত হন। এই হামলায় দুই শিশু মারা গেছে বলে অ্যাম্বুলেন্স সূত্র জানিয়েছে। গাজার দক্ষিণাঞ্চলে খান ইউনিসের দক্ষিণে কিজান আবু রাশওয়ান এলাকায় বাস্তুচ্যুতদের তাঁবুতে গোলাবর্ষণে আরও তিনজন নিহত হয়েছেন। অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ইসরাইল ও হামাসের মধ্যে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও গাজায় সহিংসতা থামেনি। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, যুদ্ধবিরতি শুরুর পর থেকে এখন পর্যন্ত ৫২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। আর যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরাইলি হামলায় মোট নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭১ হাজার ৮০৩ জনে।

মানবাধিকার সংগঠন ও জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশন ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। ইসরাইলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) একটি মামলা চলমান রয়েছে। খান ইউনিস থেকে আল জাজিরার সাংবাদিক তারেক আবু আজ্জুম বলেন, তথাকথিত যুদ্ধবিরতির মধ্যেও লাগাতার হামলায় গাজার মানুষ “এক মুহূর্তের জন্যও স্বস্তি পাচ্ছে না”। তিনি বলেন,“গত কয়েক ঘণ্টায় গাজাজুড়ে ইসরাইলি সামরিক তৎপরতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আকাশে ড্রোনের শব্দ শোনা যাচ্ছে, যা আরও হামলার আশঙ্কা তৈরি করছে।” এদিকে ইসরাইলি সেনাবাহিনী জানিয়েছে, উত্তর গাজায় তাদের সাঁজোয়া ইউনিট ও যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে, কারণ সেখানে একটি ঘটনায় এক রিজার্ভ কর্মকর্তা গুরুতর আহত হয়েছেন।

 পশ্চিম তীরে অভিযান

গাজার পাশাপাশি অধিকৃত পশ্চিম তীরেও ইসরাইলি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত রয়েছে। ফিলিস্তিনি সংবাদ সংস্থা ওয়াফার বরাতে জানা গেছে, মঙ্গলবার রাতে পশ্চিম তীরের জেরিকো শহরে ইসরাইলি বাহিনীর অভিযানে ২৪ বছর বয়সী সাঈদ নাএল আল-শেখ নামের এক ফিলিস্তিনি যুবক নিহত হন। ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ওই অভিযানে আরও তিনজন আহত হয়েছেন। এছাড়া অন্যান্য অভিযানে আরও ছয়জন ফিলিস্তিনি আহত হন-যাদের মধ্যে তিনজন গুলিবিদ্ধ, দুজনকে মারধর করা হয়েছে এবং একজন নারীকে সামরিক যান চাপা দিয়েছে।

-বেলাল হোসেন