রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ: আবুধাবিতে শুরু হচ্ছে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা

ছবিঃ সংগৃহীত

সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাজধানী আবুধাবিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা শুরু হতে যাচ্ছে। প্রায় চার বছর ধরে চলা রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটাতে এই দুই দিনের ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন আমিরাত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন ও রাশিয়ার শীর্ষ কর্মকর্তারা।

এই আলোচনার প্রাক্কালে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তি লঙ্ঘন করে রাশিয়া ইউক্রেনের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।

আবুধাবির আল শাতি প্রাসাদে অনুষ্ঠিতব্য এই বৈঠক এমন এক সময়ে শুরু হচ্ছে, যখন রাশিয়া ব্যাপক ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। প্রচণ্ড শীতের মধ্যে এসব হামলা শান্তি আলোচনার অগ্রগতিকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।

জেলেনস্কি বলেন,“রাশিয়ার প্রতিটি হামলাই প্রমাণ করে যে মস্কোর দৃষ্টিভঙ্গি বদলায়নি। তারা এখনও যুদ্ধ ও ধ্বংসের পথেই অটল এবং কূটনীতিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, এই বাস্তবতার আলোকে ইউক্রেনের আলোচক দল তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করবে।

গত মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত প্রথম দফার বৈঠক ছিল যুদ্ধ শুরুর পর মস্কো ও কিয়েভের মধ্যে প্রথম প্রকাশ্য সরাসরি আলোচনা। এই আলোচনা ইউরোপের দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সবচেয়ে ভয়াবহ সংঘাতের অবসান ঘটাতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত পরিকল্পনার অংশ।

তবে ট্রাম্প প্রশাসন গত এক বছর ধরে উভয় পক্ষকে সমঝোতায় পৌঁছাতে চাপ দিলেও মূল ইস্যুগুলোতে অচলাবস্থা এখনো কাটেনি। এ মাসের শেষ দিকে রাশিয়ার আগ্রাসনের চতুর্থ বার্ষিকী সামনে রেখে আলোচনার ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত।

অচলাবস্থার মূল কারণ কী?

আলোচনার প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পূর্ব ইউক্রেনের দখলকৃত ভূখণ্ডের দীর্ঘমেয়াদি ভবিষ্যৎ। পাশাপাশি ভবিষ্যতে রাশিয়ার সম্ভাব্য হামলা থেকে ইউক্রেনকে রক্ষা করার নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও বড় একটি ইস্যু।

মস্কো দাবি করছে, যেকোনো শান্তি চুক্তির পূর্বশর্ত হিসেবে ইউক্রেনকে ডনবাস অঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে হবে এবং পূর্ব ইউক্রেনের যে ভূখণ্ড তারা দখল করেছে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিতে হবে।

অন্যদিকে কিয়েভ বর্তমান যুদ্ধরেখা বরাবর সংঘাত ‘স্থগিত’ করার প্রস্তাব দিয়েছে এবং একতরফা সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছে।

ইউক্রেনের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান রুস্তেম উমেরভ। রাশিয়ার পক্ষে রয়েছেন সামরিক গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান ইগর কস্ত্যুকভ, যিনি ইউক্রেন আগ্রাসনে ভূমিকার জন্য পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন।

এদিকে রুশ প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত কিরিল দিমিত্রিয়েভ সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় মার্কিন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আলোচনার বিস্তারিত প্রকাশ না করা হলেও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ বৈঠককে “গঠনমূলক ও ফলপ্রসূ” বলে বর্ণনা করেছেন।

বর্তমানে রাশিয়া ইউক্রেনের প্রায় ২০ শতাংশ ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে এবং আলোচনা ব্যর্থ হলে পুরো দোনেৎস্ক অঞ্চল দখলের হুমকি দিয়েছে।

ইউক্রেন সতর্ক করে বলেছে, ভূখণ্ড ছেড়ে দিলে মস্কো আরও আগ্রাসী হয়ে উঠবে এবং ভবিষ্যতে নতুন হামলার ঝুঁকি তৈরি হবে। জনমত জরিপ অনুযায়ী, অধিকাংশ ইউক্রেনীয় নাগরিক শান্তির বিনিময়ে রাশিয়াকে ভূমি ছেড়ে দেওয়ার বিপক্ষে।

যুদ্ধক্ষেত্রে বিপুল মানবিক ক্ষতির বিনিময়ে রাশিয়া ধীরে ধীরে অগ্রগতি অর্জন করছে, অন্যদিকে ইউক্রেনের সেনাবাহিনী ক্রমেই চাপের মুখে পড়ছে।

প্রথম দফার আলোচনার পর অনেক ইউক্রেনীয়ই শান্তি চুক্তি নিয়ে সন্দিহান ছিলেন। কিয়েভের বাসিন্দা পেত্রো এএফপিকে বলেন,
“আমার মনে হয় এটি কেবল জনসাধারণকে দেখানোর জন্য একটি নাটক। আমাদের সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে, আর ভালো কিছুর আশায় থাকতে হবে।”

সূত্রঃ আল জাজিরা

বেলাল হোসেন/