মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন রণতরী ‘আব্রাহাম লিংকন’

ইরানের চলমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং তেহরান-ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই দক্ষিণ চীন সাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের অভিমুখে যাত্রা করেছে মার্কিন শক্তিশালী বিমানবাহী রণতরী ‘ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন’। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড অঞ্চলে এই রণতরী মোতায়েনকে ইরানের প্রতি ওয়াশিংটনের একটি কঠোর সামরিক সতর্কবার্তা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।

পেন্টাগন সূত্রে জানা গেছে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে এই ‘ক্যারিয়ার স্ট্রাইক গ্রুপ’-এ রয়েছে অত্যাধুনিক যুদ্ধজাহাজ, ডেস্ট্রয়ার, ফ্রিগেট এবং সাবমেরিন। বর্তমানে এটি দক্ষিণ চীন সাগর অতিক্রম করে ভারত মহাসাগর হয়ে আরব সাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এটি মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় অবস্থান নেবে। এই মোতায়েনের মাধ্যমে মূলত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছেন যে, যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মার্কিন সামরিক বাহিনী দ্রুত ব্যবস্থা নিতে সক্ষম।

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ দমনে কঠোর অবস্থান নিয়েছে তেহরান। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বারবার হুমকি দিয়েছেন যে, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ওপর সহিংসতা চালানো হলে যুক্তরাষ্ট্র চুপ করে থাকবে না। ‘সহায়তা পথে আছে’—ট্রাম্পের এমন টুইট এই রণতরী মোতায়েনের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত বলে মনে করা হচ্ছে। কাতারের আল-উদেইদ বিমানঘাঁটিসহ মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন স্থাপনাগুলোর ওপর ইরানের সম্ভাব্য পাল্টা হামলার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার কিছু সামরিক কর্মীকে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে সরিয়ে নিয়েছে। মার্কিন হামলার আশঙ্কায় ইরান ইতিমধ্যে তাদের আকাশপথ বন্ধ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি তারা প্রতিবেশীদের সতর্ক করেছে যেন তাদের ভূমি ব্যবহার করে কোনো হামলা না চালানো হয়।

মধ্যপ্রাচ্যের এই অস্থিতিশীল পরিস্থিতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক জ্বালানি তেলের বাজারে। হরমুজ প্রণালী—যা দিয়ে বিশ্বের মোট তেলের এক-পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়—তাতে অবরোধের আশঙ্কা দেখা দিলে তেলের দাম আকাশচুম্বী হতে পারে। যদিও সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে জ্বালানি তেলের সরবরাহে বিকল্প ব্যবস্থার আশাবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে, তবে যুদ্ধের দামামা বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে।

রণতরী মোতায়েনের এই সিদ্ধান্ত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার কূটনৈতিক আলোচনার পথকে কার্যত রুদ্ধ করে দিয়েছে। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, ওয়াশিংটনের ক্রমাগত সামরিক হুমকির মুখে আলোচনার আর কোনো পরিবেশ নেই। ইউরোপীয় দেশগুলোও ইতিমধ্যে তাদের নাগরিকদের ইরান ছাড়ার পরামর্শ দিয়েছে, যা একটি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

সব মিলিয়ে, ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের এই যাত্রা কেবল একটি নৌ-চলাচল নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার এক বিশাল দাবার চাল। এটি অঞ্চলটিকে যুদ্ধের দিকে ঠেলে দেবে নাকি ইরানকে নমনীয় হতে বাধ্য করবে, তা আগামী কয়েক দিনেই স্পষ্ট হবে।

-এম. এইচ. মামুন