পানির ওপর দিয়ে ছুটে চলা নৌযান, অথচ নেই ইঞ্জিনের প্রচলিত গর্জন বা ঢেউয়ের তীব্র আঘাত। দূর থেকে দেখলে মনে হয় নৌযানটি যেন পানির ওপর ‘উড়ে’ চলছে। সুইডেনের স্টকহোমের জলপথে এমনই এক ব্যতিক্রমধর্মী গণপরিবহন হিসেবে চালু হয়েছে বিশ্বের প্রথম বৈদ্যুতিক হাইড্রোফয়েল ফেরি ‘ক্যান্ডেলা পি–টুয়েলভ নোভা’।
এই নৌযানে ব্যবহৃত হয়েছে হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তি, যেখানে পানির নিচে ডানার মতো ধাতব ফয়েল নৌযানের হালকে পানির ওপরে তুলে ধরে। ফলে পানির সঙ্গে ঘর্ষণ কমে যায় এবং কম শক্তি ব্যবহার করেই বেশি গতি অর্জন সম্ভব হয়। এর ফলে নৌযানটি ঢেউ কেটে এগোয় না, বরং নীরবে ও স্থিরভাবে সামনে এগিয়ে যায়।
স্টকহোমে পরীক্ষামূলকভাবে চালানো এই বৈদ্যুতিক ফেরিগুলো দ্রুতগামী, প্রায় ঢেউহীন এবং দুলুনি কম হওয়ায় যাত্রীদের ভ্রমণও তুলনামূলকভাবে আরামদায়ক। শব্দদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কম হওয়ায় পরিবেশবান্ধব জলযান হিসেবেও এটি বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও মালদ্বীপসহ বিভিন্ন দেশ এই প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নিয়েছে।
হাইড্রোফয়েল প্রযুক্তির জন্ম উনিশ শতকের শেষভাগে। ১৮৬৯ সালে ফরাসি উদ্ভাবক ইমানুয়েল ডেনি ফারকো প্রথম এই ধরনের নৌযানের পেটেন্ট নেন। পরে ১৯০৬ সালে ইতালির লেক মাজিওরে উদ্ভাবক এনরিকো ফরলানিনি সফলভাবে একটি হাইড্রোফয়েল নৌকা চালান। এমনকি টেলিফোনের উদ্ভাবক আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলও এই প্রযুক্তি নিয়ে গবেষণা করেন। তাঁর তৈরি ‘এইচডি–৪’ নামের নৌযান ঘণ্টায় ১১৩ কিলোমিটার গতির বিশ্ব রেকর্ড গড়েছিল।
সুইডেনের কেটিএইচ রয়্যাল ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধ্যাপক ইয়াকব কুটেনকয়েলার জানান, হাইড্রোফয়েলের মূল সুবিধা হলো কম জলঘর্ষণ, বেশি গতি এবং ঢেউ সামলানোর সক্ষমতা। তবে ১৯৬০-এর দশকে জ্বালানি ও উপকরণ সীমাবদ্ধতার কারণে প্রযুক্তিটির বিকাশ থেমে যায়।
বর্তমানে উন্নত ব্যাটারি, হালকা কম্পোজিট উপকরণ, সেন্সর ও মাইক্রোকম্পিউটার প্রযুক্তির ফলে হাইড্রোফয়েলের নতুন যুগ শুরু হয়েছে। বৈদ্যুতিক শক্তির সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি জলপথের পরিবহনকে করে তুলছে আরও নীরব, দ্রুত ও পরিবেশবান্ধব।
ক্যান্ডেলা প্রতিষ্ঠাতা সুইডিশ প্রকৌশলী গুস্তাভ হাসেলস্কগ বলেন, প্রচলিত নৌযান প্রতি কিলোমিটারে গাড়ির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি শক্তি খরচ করে। তাঁর হিসাবে, হাইড্রোফয়েল ব্যবহারে নৌযানের শক্তি খরচ সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
তবে বড় আকারের নৌযানে এই প্রযুক্তি প্রয়োগ, দীর্ঘপথে চলাচল এবং চার্জিং অবকাঠামো এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও বিশেষজ্ঞদের মতে, শব্দদূষণ ও কার্বন নিঃসরণ কমাতে পানির ওপর নিঃশব্দে ‘উড়ে’ চলা এই নৌযান ভবিষ্যতের নগর ও উপকূলীয় জলপথের পরিবহনে বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি
সাবরিনা রিমি/










