ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের সবচেয়ে উত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের দুটি সংসদীয় আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনী প্রচার। নির্বাচনের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে প্রার্থীদের প্রচারের গতি ও উত্তাপ। ভোরের কাকডাকা নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে মাঠে রয়েছেন প্রার্থীরা।
পঞ্চগড় সময় থেকে গভীর রাত পর্যন্ত
পাড়ায়-মহল্লায় উঠান বৈঠক, গ্রামগঞ্জ ও হাটবাজারে গণসংযোগ, ভোটারদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোট প্রার্থনা-সব মিলিয়ে পঞ্চগড়ের দুই আসনই এখন সরগরম। প্রার্থীদের ব্যানার-ফেস্টুনে ছেয়ে গেছে পুরো এলাকা। চলছে অবিরাম মাইকিং। চায়ের দোকান, আড্ডাখানা, হাটবাজার ও গ্রামাঞ্চলে সর্বত্রই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এখন নির্বাচন। বিজয় নিশ্চিত করতে নানা কৌশল ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন প্রার্থীরা। অনেক প্রার্থীর স্ত্রী ও পরিবারের সদস্যরাও প্রচারণায় সক্রিয়
পঞ্চগড়ের দুই আসনে মোট ১৫ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে পঞ্চগড়-১ আসনে ৭ জন এবং পঞ্চগড়-২ আসনে ৮ জন প্রার্থী রয়েছেন।
পঞ্চগড়-১ আসন
পঞ্চগড়-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির, জামায়াতসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের (এনসিপি) প্রার্থী সারজিস আলম, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির মো. আব্দুল ওয়াদুদ বাদশা, গণঅধিকার পরিষদের মো. মাহাফুজার রহমান, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মো. ফেরদাউস আলম, বাংলাদেশ জাসদের নাজমূল হক প্রধান এবং বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের মো. সিরাজুল ইসলাম।
এই আসনে প্রচারণায় এগিয়ে রয়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির এবং শাপলা কলি মার্কার প্রার্থী সারজিস আলম। ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই দুই প্রার্থীর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের সম্ভাবনা রয়েছে। বিশেষ করে সনাতন সম্প্রদায় ও তরুণ ভোটারদের ভোট যেদিকে যাবে, সেই প্রার্থীর বিজয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওশাদ জমির তার পিতা সাবেক স্পিকার ও সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ব্যারিস্টার মুহাম্মদ জমির উদ্দিন সরকারের বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনের সুনাম ও দৃশ্যমান উন্নয়নের কথা তুলে ধরে ভোট চাইছেন। দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং যুবসমাজের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি ভোটারদের কাছে ধানের শীষে ভোট প্রার্থনা করছেন। তার পক্ষে প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন ছোট ভাই
ব্যারিস্টার মুহাম্মদ নওফেল জমির। অন্যদিকে সারজিস আলম ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন,
স্বৈরাচারমুক্ত দেশ গঠন, বৈষম্য দূরীকরণ, যুবসমাজের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সন্ত্রাস-দুর্নীতি-চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে শাপলা কলি মার্কায় ভোট চাইছেন। তার প্রচারণায় জামায়াত, এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা বেশ সরব। তার ছোট ভাইও প্রচারণায় সক্রিয় রয়েছেন।
এ ছাড়া বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থী, কেন্দ্রীয় জাসদের সাধারণ সম্পাদক ও সাবেক এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা নাজমুল হক প্রধানও মাঠে তৎপর রয়েছেন। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন এবং সাম্প্রতিক গণআন্দোলনে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরে তিনি মোটরগাড়ি মার্কায় ভোট চাইছেন। অন্যান্য প্রার্থীদের প্রচারণা তুলনামূলকভাবে কম চোখে পড়ছে।
গত সংসদ নির্বাচনে পঞ্চগড়-১ আসনে ভোটার ছিল ৪ লাখ ৩৬ হাজার ৯২৬ জন। সর্বশেষ হালনাগাদে এ আসনে ভোটার বেড়েছে ১৬ হাজার ৩৪৭ জন। বর্তমানে এ আসনে হিন্দু ভোটার আনুমানিক ৭৫-৮০ হাজার এবং তরুণ ভোটার ৪০-৪৫ হাজার বলে জানা গেছে।
পঞ্চগড়-২ আসন
বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত পঞ্চগড়-২ আসনেও নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির প্রয়াত নেতা কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদের জন্মস্থান হওয়ায় একসময় এই আসন ছিল বাম রাজনীতির কেন্দ্র। এখানকার ভোটাররা তুলনামূলকভাবে প্রগতিশীল ও সাংস্কৃতিকর্মনস্ক। এ আসনেও সনাতন সম্প্রদায়ের ভোট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জামায়াতসহ ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী, সাবেক উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সফিউল আলম (সফিউল্লাহ সুফি) দিনরাত প্রচারণা চালাচ্ছেন। কোরআন ও হাদিসের আলোকে রাষ্ট্র পরিচালনা, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি দাঁড়িপাল্লা মার্কায় ভোট চাইছেন। এমপি হলে নিজের ভাতা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করবেন বলেও প্রচার করছেন। তার সহধর্মিণীও মাঠে রয়েছেন।
অন্যদিকে ইসলামি আন্দোলন বাংলাদেশের হাতপাখা মার্কার প্রার্থী কামরুল হাসান প্রধান বলেন“রাজনীতি মানে জনগণের সেবা। আমি জনগণের দোয়া ও সমর্থন নিয়ে হাতপাখা প্রতীককে বিজয়ী করতে চাই।”
তিনি দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনা সম্পর্কে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করে বলেন, “ইনশাআল্লাহ আমরা ন্যায়ভিত্তিক রাজনীতি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ ও ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে একটি কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে তুলব।
দেশের উন্নয়ন হবে সমতার ভিত্তিতে, কেউ বঞ্চিত থাকবে না।” তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আশা জাগায় এবং তিনি ব্যাপক সাড়া পান।
এ ছাড়া বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থী ও কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির পল্লী উন্নয়ন বিষয়ক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন আজাদ ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাঠে রয়েছেন। গ্রামে গ্রামে উঠান বৈঠক, হাটবাজারে গণসংযোগ এবং ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে ভোট চাইছেন তিনি। দ্রুত উন্নয়ন, বেকার সমস্যা সমাধান,
দুর্নীতি ও চাঁদাবাজমুক্ত সমাজ গঠন এবং নারী ও যুবকদের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তার সহধর্মিণীকেও প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে।
দেশের উন্নয়ন হবে সমতার ভিত্তিতে, কেউ বঞ্চিত থাকবে না।” তার এই বক্তব্য সাধারণ মানুষের মনে ব্যাপক আশা জাগায় এবং তিনি ব্যাপক সাড়া পান।










