বাংলাদেশের বিশ্বকাপ বর্জনে সংকটে ভারতের অলিম্পিক বিড

বাংলাদেশের টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত শুধু ক্রিকেট অঙ্গনেই নয়, ভারতের ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের স্বপ্নেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে। খেলাধুলায় রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) যে উদ্বিগ্ন, ভারত–বাংলাদেশ ক্রিকেট সম্পর্কের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন সেই উদ্বেগ আরও বাড়িয়ে তুলেছে—এমনটাই জানিয়েছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান

প্রতিবেদনে বলা হয়, ফেব্রুয়ারিতে শুরু হতে যাওয়া টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ থেকে বাংলাদেশ সরে দাঁড়িয়েছে। বাংলাদেশের অনুরোধ ছিল, তাদের গ্রুপ পর্বের ম্যাচগুলো ভারত থেকে সরিয়ে সহ–আয়োজক শ্রীলঙ্কায় নেওয়া হোক। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) সেই অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করলে বাংলাদেশ টুর্নামেন্ট বর্জনের সিদ্ধান্ত নেয়। বাংলাদেশের জায়গায় বিশ্বকাপে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে স্কটল্যান্ডকে।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক টানাপোড়েনও কাজ করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। আইপিএলের দল কলকাতা নাইট রাইডার্স থেকে বাংলাদেশের পেসার মোস্তাফিজুর রহমানকে বাদ দেওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়ে যায়।

গার্ডিয়ান বলছে, বাংলাদেশের ম্যাচ ভারতেই রাখার সিদ্ধান্ত আইসিসি নিলেও, এ ক্ষেত্রে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই) আইসিসির ওপর প্রভাব বিস্তার করেছে—এমন ধারণা ক্রিকেট বিশ্বে রয়েছে। আইসিসি নিজেদের স্বাধীন সংস্থা হিসেবে দাবি করলেও অতীতে বিসিসিআইয়ের পক্ষে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নজির আছে। প্রতিবেদনে ২০২৪ টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সম্প্রচার ও আর্থিক সুবিধার কারণে ভারতকে গায়ানায় নিশ্চিত সেমিফাইনাল দেওয়ার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে।

আইসিসিতে বিসিসিআইয়ের প্রভাব অত্যন্ত শক্তিশালী এবং ভারতীয় সরকারের সঙ্গেও বোর্ডটির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। বর্তমান আইসিসি চেয়ারম্যান জয় শাহ আগে বিসিসিআইয়ের সচিব ছিলেন, তার বাবা অমিত শাহ ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। আইসিসির প্রধান নির্বাহী সঞ্জোগ গুপ্তও আগে ভারতের মিডিয়া জায়ান্ট জিওস্টারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এই বিতর্ক ভারতের জন্য সংবেদনশীল এক সময়ে সামনে এসেছে। সম্প্রতি দিল্লিতে ২০৩০ কমনওয়েলথ গেমস আয়োজনের অনুমোদন পেয়েছে ভারত। পাশাপাশি আহমেদাবাদে ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের জন্যও জোরালো বিড করছে দেশটি, যেখানে কাতারকে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে আইওসি খেলাধুলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের বিষয়ে আইসিসির তুলনায় অনেক বেশি কঠোর। গার্ডিয়ানকে আইওসির এক সূত্র জানিয়েছেন, অন্য দেশগুলোর বয়কটের আশঙ্কা থাকলে ভারতকে অলিম্পিক আয়োজনের দায়িত্ব দেওয়া ‘অচিন্তনীয়’ হয়ে উঠতে পারে।

অলিম্পিক চার্টার অনুযায়ী, ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থাকতে হবে। অলিম্পিক মঞ্চে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় মত প্রকাশও নিষিদ্ধ।

আইওসির কঠোর অবস্থানের উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে ইন্দোনেশিয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। ইসরায়েলি দলকে ভিসা দিতে অস্বীকৃতি জানানোয় ইন্দোনেশিয়াকে ভবিষ্যৎ অলিম্পিক আয়োজন সংক্রান্ত আলোচনা থেকেও সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল।

বিশ্ব ক্রিকেট রাজনীতি তাই ২০৩৬ অলিম্পিক আয়োজনের দৌড়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ক্রিকেট ১৯০০ সালের পর প্রথমবার অলিম্পিকে ফিরছে ২০২৮ লস অ্যাঞ্জেলেস গেমসে এবং ২০৩২ ব্রিসবেনেও থাকছে সূচিতে। আইওসি ভারতীয় বাজারকে আকৃষ্ট করতে ক্রিকেটকে অন্তর্ভুক্ত করলেও, রাজনৈতিক ঝুঁকি নিয়ে যে কোনো মূল্যে তা করবে না—এমন ইঙ্গিতও প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে পাকিস্তানও বাংলাদেশের প্রতি সংহতি জানিয়ে টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপ বয়কটের কথা ভাবছে বলে উল্লেখ করেছে গার্ডিয়ান। পাশাপাশি ভারত–পাকিস্তান দ্বিপক্ষীয় সিরিজ বন্ধ থাকা এবং চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ইস্যু নিয়েও দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা বিরাজমান।

আইওসি সূত্রের মতে, অলিম্পিক আয়োজনের জন্য বিশ্বাসযোগ্য প্রার্থী হতে হলে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের স্পষ্ট বার্তা দিতে হবে ভারতকে। কারণ অলিম্পিকের মূল চেতনা হলো—পুরো বিশ্বকে এক মঞ্চে একত্র করা।

-সাইমুন