শব্দতরঙ্গ দিয়ে মহাকাশের আবর্জনা শনাক্তের নতুন পদ্ধতি আবিষ্কার

ছবি: সংগৃহীত

পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে ছিটকে পড়া মহাকাশের আবর্জনা দিন দিন বড় হুমকিতে পরিণত হচ্ছে। এখন বিজ্ঞানীরা বলছেন, এসব বস্তু যখন বায়ুমণ্ডলের ভেতর দিয়ে প্রচণ্ড গতিতে ছুটে আসে, তখন সৃষ্ট সনিক বুম (শব্দ-আঘাত) ব্যবহার করে সেগুলো শনাক্ত ও অনুসরণ করার একটি নতুন উপায় পাওয়া গেছে।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো উপগ্রহ ও মহাকাশযানের অংশবিশেষ প্রতিদিন গড়ে তিনবারেরও বেশি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশ করে। এসব বস্তু পুড়ে যাওয়ার সময় ক্ষতিকর রাসায়নিক নির্গত হতে পারে। আবার কোনো অংশ ভূপৃষ্ঠে পৌঁছালে তা পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ভবন, অবকাঠামো এমনকি মানুষের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ট্র্যাক করা কঠিন কেন?

মহাকাশের আবর্জনা সাধারণত ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৮ হাজার মাইল গতিতে চলতে চলতে হঠাৎ কক্ষপথ ছাড়ে। বর্তমানে রাডার ও অপটিক্যাল পদ্ধতিতে এসব বস্তু শনাক্ত করা হলেও, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টুকরো টুকরো হয়ে গেলে ঠিক কোথায় তা পড়তে পারে সে বিষয়ে নির্ভুল পূর্বাভাস দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে বিপজ্জনক বা বিষাক্ত ধ্বংসাবশেষ দ্রুত উদ্ধার বা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক সময় সম্ভব হয় না।

ভূমিকম্প মাপার যন্ত্রে মিলল নতুন সূত্র

এ প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স ইউনিভার্সিটি ও যুক্তরাজ্যের ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন–এর গবেষকরা এক ভিন্নধর্মী পদ্ধতির কথা জানিয়েছেন। তারা ভূমিকম্প শনাক্তে ব্যবহৃত সিসমোমিটার দিয়ে মহাকাশের আবর্জনার তৈরি সনিক বুম ধরার প্রস্তাব দিয়েছেন।

কোনো বস্তু শব্দের গতিবেগ অতিক্রম করলে যে শকওয়েভ তৈরি হয়, সেটিই সনিক বুম। গবেষকদের মতে, বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় পড়তে থাকা মহাকাশের আবর্জনাও এমন শব্দতরঙ্গ সৃষ্টি করে, যা মাটিতে পৌঁছে সিসমোমিটারে ধরা পড়ে।

মঙ্গল গ্রহের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো

জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের পোস্টডক্টরাল গবেষক বেনজামিন ফার্নান্দো বলেন,
“দীর্ঘদিন ধরেই জানা ছিল যে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করা মহাকাশের ধ্বংসাবশেষ প্রাকৃতিক উল্কা বা সুপারসনিক বিমানের মতোই সনিক বুম তৈরি করে।”

ফার্নান্দো নাসার ইনসাইট (InSight) মিশনে কাজ করেছিলেন, যেখানে মঙ্গল গ্রহে একটি মাত্র সিসমোমিটার ব্যবহার করে উল্কার আঘাত শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। ২০১৮ সালে অবতরণ করা ইনসাইট ল্যান্ডার এখন পর্যন্ত ১ হাজার ৩০০–এর বেশি ‘মার্সকোয়েক’ শনাক্ত করেছে, যার কয়েকটি ঘটেছিল উল্কার আঘাতে।

তিনি জানান, “এই গবেষণার বড় অগ্রগতি হলো পৃথিবী ও মঙ্গলে প্রাকৃতিক উল্কা বিশ্লেষণে ব্যবহৃত কৌশলগুলো এখন পৃথিবীর মহাকাশ আবর্জনা শনাক্তে প্রয়োগ করা।”

শেনঝৌ–১৫ দিয়ে পরীক্ষা

নতুন পদ্ধতি যাচাই করতে গবেষকরা চীনের শেনঝৌ–১৫ মহাকাশযানের একটি অনিয়ন্ত্রিত পুনঃপ্রবেশ বিশ্লেষণ করেন। ২০২২ সালের এই মিশনের একটি অংশ ২০২৪ সালের এপ্রিল মাসে ক্যালিফোর্নিয়ার আকাশ দিয়ে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে।

প্রায় দেড় টনের বেশি ওজনের ওই অংশটি পুড়ে যাওয়ার সময় সৃষ্ট সনিক বুম মাটিতে পৌঁছে এমন কম্পন তৈরি করে, যা ভূমিকম্পের মতো না হলেও সিসমোমিটারে ধরা পড়ে। গবেষকরা ১২৫টি সিসমোমিটারের তথ্য বিশ্লেষণ করে বস্তুটির আকাশপথে চলাচলের সম্ভাব্য গতিপথ নির্ধারণ করেন।

যুক্তরাষ্ট্রের স্পেস ফোর্সের রাডারভিত্তিক পূর্বাভাসের সঙ্গে তুলনা করে দেখা যায়, নতুন পদ্ধতিতে পাওয়া পথটি প্রায় ২৫ মাইল (৪০ কিলোমিটার) বেশি দক্ষিণে ছিল। তবে কোনো ধ্বংসাবশেষ উদ্ধার না হওয়ায় কোনটি সঠিক মতা নিশ্চিত করে বলা যায়নি।

দ্রুত সতর্কতা ব্যবস্থার সম্ভাবনা

ফার্নান্দো বলেন, ভবিষ্যতে এই পদ্ধতিকে একটি বেসামরিক নজরদারি ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে। উন্মুক্ত সিসমোগ্রাফ ডেটা ব্যবহার করে কোনো বস্তু কোথায় পড়েছে, তা দ্রুত চিহ্নিত করা সম্ভব হতে পারে।

তার মতে, সনিক বুম স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করা গেলে পুনঃপ্রবেশের কয়েক সেকেন্ড বা মিনিটের মধ্যেই সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যাবে। বাতাসের গতি–দিকসহ অন্যান্য উপাদান বিশ্লেষণ করে দ্রুত উদ্ধার কার্যক্রমও চালানো সম্ভব হবে।

পরিবেশগত উদ্বেগ

ফার্নান্দো দুটি উদাহরণ তুলে ধরেন। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত উপগ্রহ কসমস ৯৫৪ ভেঙে কানাডার উত্তরাঞ্চলে তেজস্ক্রিয় ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে পড়ে, যার বেশিরভাগ আজও উদ্ধার হয়নি।

আরেকটি ঘটনা ২০২৫ সালের শুরুতে ক্যারিবীয় অঞ্চলে স্পেসএক্স স্টারশিপ রকেটের বিস্ফোরণ, যার ফলে বিমান চলাচল ব্যাহত হয় এবং সমুদ্র ও আবাসিক এলাকায় ভারী ধাতব বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ে।

তিনি বলেন,
“পুনঃপ্রবেশের ফলে বায়ুমণ্ডলের গঠনও ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে। অনেক মহাকাশযানে ব্যবহৃত রাসায়নিক অত্যন্ত বিষাক্ত এবং ওজোন স্তর ক্ষয়ের সম্ভাবনাও তৈরি করে। বিষয়টি গুরুতর, অথচ এর প্রভাব সম্পর্কে আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না।”

গবেষকদের মূল্যায়ন

বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাস্ট্রোনটিক্স অধ্যাপক হিউ লুইস বলেন, বিদ্যমান সিসমিক নেটওয়ার্ক ব্যবহার করায় এই পদ্ধতি কম খরচে ও বড় পরিসরে প্রয়োগযোগ্য।

তবে টেক্সাস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোরিবা জাহ সতর্ক করে বলেন, সব ধ্বংসাবশেষ এত শক্তিশালী সনিক বুম তৈরি করে না। অনেক বস্তু ছোট হওয়ায় বা উচ্চতায় ভেঙে যাওয়ায় সিসমোমিটারে ধরা পড়ে না। ফলে এটি একক সমাধান নয়, বরং রাডার ও স্যাটেলাইট নজরদারির সহায়ক পদ্ধতি হতে পারে।

অবার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডেভিডে গুজেত্তি মনে করেন, এই পদ্ধতি পুনঃপ্রবেশের সময় বস্তুর ভাঙনের ধরন বোঝার ক্ষেত্রেও নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে। ভবিষ্যতে নাগরিক বিজ্ঞান প্রকল্পের মাধ্যমে সাধারণ মানুষও সনিক বুম শনাক্তে ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশাবাদী।

সূত্র: সিএনএন

সাবরিনা রিমি/