বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম আসন্ন ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটকে ‘প্রতারণাপূর্ণ’ ও ‘অপ্রয়োজনীয়’ বলে অভিহিত করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে আয়োজিত এই গণভোটে কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ পক্ষকে জিততে দেওয়া হবে না।
মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর দ্য ডেইলি স্টার কনফারেন্স হলে বাংলাদেশ আদিবাসী যুব ফোরাম আয়োজিত ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতিনির্ধারণে আদিবাসী জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, “যারা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে, তারা ইতোমধ্যে হেরে গেছে। তারা বুঝে গেছে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এটি সমর্থন করবে না, তাই সরকারি টাকা খরচ করে প্রশাসনকে দিয়ে এটি করানোর চেষ্টা চলছে।”
আলোচনায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সতেজ চাকমা। তিনি জানান, ২০২৫ সালে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর ৯৩টি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। তিনি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র গঠনে রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহার সমালোচনা করেন। ফোরামের পক্ষ থেকে ছয়টি দাবি উত্থাপন করা হয়: ১. ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিচয়ের সাংবিধানিক স্বীকৃতি। ২. ভূমি অধিকারের স্বীকৃতি। ৩. পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন। ৪. প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির চাকরিতে ৫ শতাংশ কোটা পুনর্বহাল। ৫. সংসদে আসন সংরক্ষণ। ৬. নিজ নিজ ভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা চালু।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হয়নি বলে গোলটেবিলে অভিযোগ করেন আইনজীবী সারা হোসেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জনগণকে সুরক্ষা দিতে ব্যর্থ হয়েছে এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো পার্বত্য চুক্তি বাতিলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহমুদুল হাসান এবং বাসদের রাজেকুজ্জামান রতনও রাষ্ট্রের এই ‘প্রতারণামূলক’ ভূমিকার সমালোচনা করেন। তারা মনে করেন, সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার অস্বীকার করা হয়েছে এবং নির্বাচনের সময় তারা সবসময় প্রভাবশালী মহলের নিগ্রহের শিকার হন। ঢাকা-১২ আসনের প্রার্থী তাসলিমা আখতারের মতে, সব জাতিসত্তার অংশগ্রহণে দেশ স্বাধীন হলেও সংসদে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব নেই বললেই চলে। বক্তাদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির এই ‘দ্বৈত ভোট’ (সংসদ নির্বাচন ও গণভোট) মূলত জনগণের ওপর একটি বিতর্কিত সনদ চাপিয়ে দেওয়ার কৌশল।
আলোচনায় পাহাড় ও সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বঞ্চনার কথা তুলে ধরে সেলিম বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক কাঠামো সবসময় আদিবাসীদের বঞ্চিত করেছে। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর নতুন বন্দোবস্তের কথা বলা হলেও সমাজের প্রতিটি স্তরে বৈষম্য এখনো প্রকট। তিনি অভিযোগ করেন, সংস্কারের নাম দিয়ে স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি দেশকে পেছনে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। গরিব, মেহনতি ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠিত না হলে দেশে আবারও গণ-অভ্যুত্থান ঘটবে বলে তিনি সতর্ক করেন।