ব্যস্ততায় যোগব্যায়ামের জাদুকরী শক্তি

যোগব্যায়াম কেবল কতগুলো ব্যায়ামের সমষ্টি নয়; এটি একটি প্রাচীন জীবনদর্শন, যা মানুষের শারীরিক, মানসিক এবং আধ্যাত্মিক সত্তার মধ্যে এক অপূর্ব সমন্বয় ঘটায়।

আধুনিক সভ্যতার দ্রুতগতির জীবনে আমরা প্রতিনিয়ত উন্নতির পেছনে ছুটছি, কিন্তু এই দৌড়াতে গিয়ে আমরা হারিয়ে ফেলছি আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—স্বাস্থ্য। বর্তমান যুগের ব্যস্ততা, যান্ত্রিকতা, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং তীব্র মানসিক চাপ আমাদের শরীর ও মনকে ক্রমেই পঙ্গু করে দিচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ কম্পিউটার স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা, কায়িক পরিশ্রমের অভাব এবং প্রক্রিয়াজাত খাবারের আসক্তি আমাদের ঠেলে দিচ্ছে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার মতো দীর্ঘমেয়াদি রোগের দিকে। এই জটিল পরিস্থিতিতে শরীর ও মনকে প্রকৃতির কাছাকাছি ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার এবং পূর্ণাঙ্গ সুস্থতা লাভের সবচেয়ে কার্যকর ও প্রাকৃতিক উপায় হলো যোগব্যায়াম।

শ্বাসপ্রক্রিয়া ও হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা-

যোগব্যায়ামের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো ‘প্রাণায়াম’ বা শ্বাস নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি। আমাদের ফুসফুসের পূর্ণ ক্ষমতা আমরা খুব কমই ব্যবহার করি। প্রাণায়ামের মাধ্যমে ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পায়, যা রক্তে অক্সিজেনের সরবরাহ নিশ্চিত করে। এর ফলে হৃৎপিণ্ড সতেজ থাকে এবং উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আসে। সঠিক রক্ত সঞ্চালনের ফলে শরীরের প্রতিটি কোষে পুষ্টি পৌঁছায়, যা আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করে এবং হৃদরোগের ঝুঁকি কমিয়ে দেয়।

মানসিক প্রশান্তি ও একাগ্রতা-

বর্তমান সময়ে শারীরিক অসুস্থতার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে মানসিক অস্থিরতা। ডিপ্রেশন, উদ্বেগ বা এনজাইটি এবং দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ আমাদের সৃজনশীলতা ও কর্মক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। যোগব্যায়াম ও ধ্যান  সরাসরি আমাদের স্নায়ুতন্ত্রকে শান্ত করে। এটি শরীরে ‘হ্যাপি হরমোন’ বা এন্ডোরফিন নিঃসরণে সাহায্য করে, যা মনকে উৎফুল্ল রাখে। নিয়মিত ২০-৩০ মিনিট যোগচর্চা করলে একাগ্রতা ও ধৈর্য বাড়ে, যা শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় এবং চাকরিজীবীদের কর্মক্ষেত্রে ভালো করতে সহায়তা করে। এছাড়া নিয়মিত ধ্যান অনিদ্রা বা ঘুমের সমস্যা দূর করে জীবনকে করে তোলে শান্ত ও সুশৃঙ্খল।

হজমশক্তি ও ওজন নিয়ন্ত্রণ-

আমাদের সুস্বাস্থ্যের অনেকটা নির্ভর করে আমাদের বিপাকক্রিয়ার মেটাবলিজম ওপর। যোগব্যায়াম পেটের অভ্যন্তরীণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গগুলোকে উদ্দীপিত করে, যা হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। কোষ্ঠকাঠিন্য, গ্যাস বা অ্যাসিডিটির মতো সাধারণ কিন্তু যন্ত্রণাদায়ক সমস্যা থেকে মুক্তি পেতে যোগব্যায়াম জাদুর মতো কাজ করে। পাশাপাশি শরীরের অতিরিক্ত মেদ ঝরিয়ে ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখতে এটি অত্যন্ত কার্যকর। শরীর যখন ভেতর থেকে পরিষ্কার থাকে, তখন ত্বকের উজ্জ্বলতা বাড়ে এবং নিজেকে অনেক বেশি সজীব মনে হয়।
সবার জন্য উন্মুক্ত এক পথ।

যোগব্যায়ামের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এটি কোনো বয়স বা বিশেষ সরঞ্জামের ওপর নির্ভরশীল নয়। এটি করতে দামী কোনো জিমের সদস্য হতে হয় না বা ভারী কোনো যন্ত্রপাতির প্রয়োজন পড়ে না। শিশু থেকে শুরু করে বয়স্ক—প্রত্যেকেই নিজের শারীরিক সামর্থ্য অনুযায়ী যোগচর্চা করতে পারেন। এটি কোনো প্রতিযোগিতামূলক খেলা নয়, বরং এটি নিজের সাথে নিজের পরিচয়ের একটি মাধ্যম।

সুস্থ থাকা কোনো বিলাসিতা নয়, বরং এটি আমাদের অধিকার এবং দায়িত্ব। প্রতিদিনের ব্যস্ততা থেকে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিট সময় যোগব্যায়ামের জন্য বরাদ্দ রাখলে তার সুফল পাওয়া যাবে সারা জীবন। সুস্থ শরীর, শান্ত মন এবং একটি সতেজ প্রাণশক্তি পেতে যোগব্যায়ামকে আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অংশ করে নেওয়া আজ সময়ের দাবি। ভারসাম্যপূর্ণ ও সুন্দর জীবনের চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এই প্রাচীন ভারতীয় যোগসাধনাতেই।

-বিথী রানী মণ্ডল