সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না পাওয়ার নেপথ্যে: আইনি জটিলতা নাকি আবেদনগত ভুল

বাগেরহাট সদর উপজেলা নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও সন্তানের জানাজার জন্য প্যারোল চেয়েও পাননি বলে যে খবরটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আলোচিত হচ্ছে, তার ভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে প্রশাসনিক তদন্তে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাদ্দাম যশোর কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থায় তার পরিবার ভুল জেলায় প্যারোলের আবেদন করেছিল এবং পরবর্তীতে সঠিক পদ্ধতিতে আবেদনটি আর সম্পন্ন করা হয়নি।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও জনমনে বিভ্রান্তি:
গত ২৩ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালী ও তাদের পুত্রসন্তান শেহজাদ হাসান নাজিফ মৃত্যুবরণ করেন। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয় যে, স্বর্ণালী তার সন্তানকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করেছেন। তবে পুলিশ জানিয়েছে বিষয়টি এখনো তদন্তাধীন, তাই এটি ‘হত্যা’ নাকি ‘আত্মহত্যা’ তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এই শোকাবহ পরিস্থিতিতে স্ত্রী-সন্তানকে শেষবার দেখার জন্য সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি না হওয়া এবং জেলগেটে লাশ নিয়ে যাওয়ার ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। অনেক গণমাধ্যম দাবি করে যে, সরকার বা কারা কর্তৃপক্ষ প্যারোল দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। তবে অনুসন্ধানে দেখা যাচ্ছে, ২০১৬ সালের সংশোধিত কারাবিধি এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের এখতিয়ার সংক্রান্ত জটিলতাই ছিল এর মূল কারণ।
প্যারোলের আবেদন নিয়ে যত জল্পনা কল্পনা:
জুয়েল হাসান সাদ্দামের প্যারোলে মুক্তি নিয়ে গণমাধ্যমে যে সংবাদগুলো প্রকাশিত হয়েছে, সেখানে আবেদনের প্রক্রিয়াগত জটিলতার বিষয়টি প্রায় এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘটনার পর সাদ্দামের পরিবারের পক্ষ থেকে জরুরি ভিত্তিতে বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট” বরাবর প্যারোলের আবেদন করা হয়েছিল। কিন্তু আইনি সীমাবদ্ধতার কারণে এই আবেদনটি ছিল অকার্যকর। যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের স্পষ্ট বক্তব্য অনুযায়ী, যেহেতু সাদ্দাম যশোর কারাগারে বন্দি ছিলেন, তাই তার প্যারোল মঞ্জুর করার আইনি এখতিয়ার কেবল যশোর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটেরই ছিল। বাগেরহাট জেলা প্রশাসন থেকে পরিবারকে নিয়ম অনুযায়ী যশোরে আবেদনের পরামর্শ দেওয়া হলেও, শেষ পর্যন্ত সাদ্দামের পরিবারের পক্ষ থেকে যশোরে কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা পড়েনি। বরং পরিবার সিদ্ধান্ত নেয় লাশ বাগেরহাট থেকে যশোরে নিয়ে যাওয়ার। এই গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি এড়িয়ে গিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়।
বিশেষ করে, বেশ কিছু গণমাধ্যম “প্যারোলে মুক্তি মেলেনি” শিরোনামে সংবাদ প্রচার করলেও বন্দি কোন কারাগারে ছিলেন বা আবেদন কোথায় করা হয়েছিল—সেই কারিগরি তথ্যগুলো তুলে ধরা হয়নি। ফলে জনমনে ধারণা তৈরি হয়েছে যে, আবেদন করার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে প্যারোল দেওয়া হয়নি। মূলত, আইনি প্রক্রিয়ার ভুল এবং সময়মতো সঠিক কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন না পৌঁছানোই ছিল সাদ্দামের প্যারোল না পাওয়ার প্রধান কারণ।
প্যারোল বিষয়ক নীতিমালায় কী আছে:
২০১৬ সালে সংশোধিত “প্যারোলে মুক্তি সংক্রান্ত নীতিমালা” অনুযায়ী, কোনো বন্দিকে বিশেষ পরিস্থিতিতে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা সুনির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। এই নীতিমালার ‘খ’ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, “সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞ জেলা ম্যাজিস্ট্রেট প্যারোল মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে বিবেচিত হবেন।” অর্থাৎ, আইনিভাবে কেবল জেলা ম্যাজিস্ট্রেটই এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা রাখেন।
এক জেলার আসামি অন্য জেলার কারাগারে বন্দি থাকলে প্যারোল প্রক্রিয়া কীভাবে কার্যকর হবে, সে বিষয়ে নীতিমালার ৪ নম্বর ধারায় বিস্তারিত বলা হয়েছে:
“কোনো বন্দি জেলার কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে ওই জেলার অভ্যন্তরে যেকোনো স্থানে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। অপরদিকে কোনো বন্দি নিজ জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক না থেকে অন্য জেলায় অবস্থিত কোনো কেন্দ্রীয়/জেলা/বিশেষ কারাগার/সাব জেলে আটক থাকলে গন্তব্যের দূরত্ব বিবেচনা করে মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর করতে পারবেন। তবে উভয় ক্ষেত্রেই দুর্গম এলাকা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, দূরত্ব ও নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় মঞ্জুরকারী কর্তৃপক্ষ প্যারোল মঞ্জুর কিংবা না-মঞ্জুরের ক্ষমতা সংরক্ষণ করবেন।”
এই নীতিমালার ব্যাখ্যা নিয়ে বাংলাফ্যাক্ট যখন একাধিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞের (Criminal Law Expert) সাথে যোগাযোগ করে, তখন দুটি গুরুত্বপূর্ণ মত উঠে আসে:
প্রথম মত: বন্দি যে জেলার কারাগারে বর্তমানে আটক আছেন, সেই জেলার ম্যাজিস্ট্রেট ছাড়া অন্য কোনো জেলার ম্যাজিস্ট্রেট প্যারোলের আবেদন মঞ্জুর করতে পারেন না। এক জেলার ম্যাজিস্ট্রেসি এখতিয়ার অন্য জেলার ম্যাজিস্ট্রেট খর্ব করা আইনের পরিপন্থী। যেহেতু সাদ্দাম যশোরে বন্দি ছিলেন, তাই বাগেরহাটের ম্যাজিস্ট্রেটের এখানে কিছু করার ছিল না।
দ্বিতীয় মত: মানবিক কারণে ম্যাজিস্ট্রেট তার ‘ডিসক্রিশনারি পাওয়ার’ বা বিবেচনামূলক ক্ষমতা ব্যবহার করে প্যারোলে মুক্তি দিতে পারতেন। সরকারি কাজে নমনীয়তা আনতে এবং আইনের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বিশেষ পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার এই স্বাধীনতাকে ডিসক্রিশনারি পাওয়ার বলা হয়। তবে এই ক্ষমতা ব্যবহারের জন্যও শর্ত ছিল—সাদ্দামের পক্ষ থেকে যশোরে আবেদন করতে হতো, যা করা হয়নি।
বাগেরহাটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মেজবাহ উদ্দীনও এই নীতিমালার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান যে, আইনত বাগেরহাট জেলা ম্যাজিস্ট্রেট সাদ্দামকে মুক্তি দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না। এছাড়া নীতিমালার শর্ত অনুযায়ী, কর্তৃপক্ষ যদি মনে করেন যে যশোর থেকে বাগেরহাট পর্যন্ত ১০৫ কিলোমিটার পথে বন্দির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয় কিংবা এলাকায় তিনি জনরোষের শিকার হতে পারেন, তবে তারা প্যারোল না-মঞ্জুর করতে পারেন। উল্লেখ্য, সাদ্দাম নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য তন্ময় শেখের ঘনিষ্ঠ অনুচর হওয়ায় তার ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ঝুঁকিও এই নীতিমালার আলোকে বিবেচ্য ছিল।
অন্যদিকে পরিবার বলছে:
সাদ্দামের ছোট ভাই শহিদুল ইসলামের দাবি, তারা প্রথমে বাগেরহাটের জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করলে তিনি তাদের জেল সুপারের কাছে পাঠান। কিন্তু জেল সুপার জানান যে, প্যারোলে মুক্তির সুযোগ নেই, কেবল লাশ জেলগেটে এনে দেখা যাবে। শহিদুল আরও জানান, তারা যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়েও লোক পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু ছুটির দিন হওয়ায় সেখানে কাউকে পাওয়া যায়নি এবং গেটের দায়িত্বরত ব্যক্তি তাদের ভুল তথ্য দিয়ে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই দাবি অস্বীকার করা হয়েছে; যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জানিয়েছেন, তারা সেদিন অফিসেই ছিলেন কিন্তু পরিবারের কেউ কোনো আবেদন নিয়ে আসেনি।
লামিয়া আক্তার