মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে তিন ধাপে অনুষ্ঠিত বিতর্কিত জাতীয় নির্বাচনের চূড়ান্ত পর্ব সম্পন্ন হয়েছে। দেশজুড়ে ৬০টি টাউনশিপে ভোটগ্রহণের মাধ্যমে দীর্ঘ এই নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সমাপ্তি ঘটে।
আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, জান্তা সমর্থিত ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) এই নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয়ের দিকে এগিয়ে রয়েছে।
ইয়াঙ্গুন ও মান্দালয়ের মতো প্রধান শহরগুলোতে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হলেও ভোটার উপস্থিতি ছিল খুবই কম। নির্বাচনের প্রথম দুই ধাপে মাত্র ৫৫ শতাংশ ভোট পড়েছে বলে জানা গেছে, যা ২০১৫ ও ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানিয়েছে, প্রথম দুই ধাপের ভোটগণনা শেষে ইউএসডিপি এককভাবে নিম্নকক্ষের ২০৯টি আসনের মধ্যে ১৯৩টি এবং উচ্চকক্ষের ৭৮টি আসনের মধ্যে ৫২টি আসনে জয় অর্জন করে প্রভাব বিস্তার করেছে।
উল্লেখ্য, ২০০৮ সালের সংবিধান অনুযায়ী সংসদের উভয় কক্ষে ২৫ শতাংশ আসন সরাসরি সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত। ফলে জান্তা সমর্থিত দল এবং সেনাবাহিনীর সংরক্ষিত আসন মিলিয়ে সরকার গঠনে তাদের সামনে কোনো বড় চ্যালেঞ্জ নেই। বিশ্লেষকদের ধারণা, জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইং সেনাপ্রধানের পদ থেকে সরে এসে এই নির্বাচনের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট হিসেবে রাজনৈতিক ভূমিকায় প্রবেশ করতে যাচ্ছেন। এপ্রিলে নতুন সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে জান্তা কর্তৃপক্ষের।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই নির্বাচন তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট আসিয়ান (আসিয়ান) এই নির্বাচনে কোনো পর্যবেক্ষক পাঠায়নি এবং নির্বাচনের ফলাফল স্বীকৃতি না দেওয়ার অবস্থান জানিয়েছে।
জাতিসংঘ ও পশ্চিমা দেশগুলো এই নির্বাচনকে ‘প্রহসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, অং সান সু চির জনপ্রিয় দল ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসিকে ভেঙে দেওয়া এবং সু চিকে কারাবন্দি রাখার মাধ্যমে জান্তা সরকার অসম প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি করেছে। তাদের ধারণা, এই নির্বাচনের মূল লক্ষ্য সামরিক শাসনকে বেসামরিক বৈধতার আবরণ দেওয়া।
মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠী ও সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ চলমান থাকায় অনেক স্থানে ভোটগ্রহণ সম্ভব হয়নি। রাখাইন, শান ও কায়িন রাজ্যে বিমান হামলা ও লড়াইয়ের খবর পাওয়া গেছে। দেশটির সাধারণ মানুষের মধ্যে গ্রেফতার বা প্রতিহিংসার ভয় কাজ করছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
নির্বাচনী আইন ভঙ্গ বা সমালোচনার অভিযোগে জান্তা সরকার ইতোমধ্যে চার শতাধিক মানুষকে কারাদণ্ড দিয়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির মধ্যেই মিয়ানমার একটি নতুন রাজনৈতিক কাঠামোর দিকে অগ্রসর হচ্ছে, যা দেশটির গণতন্ত্রপন্থী জনগণের প্রত্যাশার প্রতিফলন কি না—তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে।
সূত্র: রয়টার্স
আফরিনা সুলতানা/










