বিশ্বে ব্যাংকিং সেবার বাইরে থাকা প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ মাত্র আটটি দেশের নাগরিক। এসব দেশের তালিকায় বাংলাদেশও রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ডেটাবেজ ২০২৫’ প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সারা বিশ্বে বর্তমানে প্রায় ১৩০ কোটি মানুষের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব নেই। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর ৫৩ শতাংশ বা প্রায় ৬৫ কোটি মানুষ বাংলাদেশসহ মাত্র আটটি দেশে বসবাস করছেন। তালিকায় থাকা অন্য দেশগুলো হলো চীন, ভারত, পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মিসর, নাইজেরিয়া ও মেক্সিকো।
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রায় সব প্রাপ্তবয়স্ক মানুষেরই ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাব রয়েছে। অন্যদিকে ব্যাংক হিসাবহীন জনগোষ্ঠীর বড় অংশ অবস্থান করছে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১১ সালে বিশ্বের প্রায় অর্ধেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের কোনো আর্থিক হিসাব ছিল না। এক দশক পর ২০২১ সালে এই হার কমে ২৬ শতাংশে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালে তা আরও কমে ২১ শতাংশে নেমে এসেছে। অগ্রগতি সত্ত্বেও এখনো প্রায় ১৩০ কোটি প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। এর ফলে তারা ব্যাংকিং ও আর্থিক সেবার প্রত্যক্ষ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আর্থিক হিসাবের বিস্তার বাড়লেও যারা এখনো এর বাইরে রয়েছেন, তারা তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। এদের মধ্যে নারী, দরিদ্র জনগোষ্ঠী এবং যাদের শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশি নয়—এমন মানুষের সংখ্যা বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক হিসাবহীন ১৩০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭০ কোটির বেশি বা ৫৫ শতাংশ নারী। এছাড়া ৬৭ কোটি মানুষ, যা মোটের ৫২ শতাংশ, আয়ের দিক থেকে সবচেয়ে দরিদ্র ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ৭৯ কোটি মানুষ বা ৬২ শতাংশ প্রাথমিক শিক্ষা বা তার কম শিক্ষিত। আবার ৬৯ কোটি মানুষ, অর্থাৎ ৫৪ শতাংশ কর্মসংস্থানের বাইরে রয়েছেন অথবা বেকার। বয়সভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, হিসাবহীন জনগোষ্ঠীর মধ্যে ৩৮ কোটি মানুষের বয়স ১৫ থেকে ২৪ বছর, ৫৯ কোটির বয়স ২৫ থেকে ৫৪ বছর এবং ৩২ কোটির বয়স ৫৫ বছর বা তার বেশি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও ডিজিটাল রূপান্তর নিয়ে আলোচনা চললেও বিশ্বের একটি বড় অংশ এখনো আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার বাইরে রয়ে গেছে। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশে ব্যাংক হিসাবহীন মানুষের সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বেশি। এই বাস্তবতা দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তির চিত্র নতুন করে সামনে এনেছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে ব্যাংক হিসাব না থাকার প্রধান ছয়টি বাধা চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো পর্যাপ্ত অর্থের অভাব, আর্থিক সেবার উচ্চ ফি, পরিবারের অন্য সদস্যের নামে হিসাব থাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের দূরবর্তী অবস্থান, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতি আস্থার ঘাটতি এবং প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের অভাব। এর মধ্যে পর্যাপ্ত অর্থ না থাকাকে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধক হিসেবে উল্লেখ করেছেন অধিকাংশ মানুষ।
প্রতিবেদনে উদাহরণ হিসেবে বলা হয়েছে, মিসরে ব্যাংক হিসাব না থাকা মানুষের ৯০ শতাংশই জানিয়েছেন, তাদের কাছে হিসাব খোলা ও পরিচালনার মতো পর্যাপ্ত অর্থ নেই। অনেকেই আর্থিক সেবার অতিরিক্ত ফিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এই কারণে সাশ্রয়ী মূল্যের হিসাব, বিশেষ করে মোবাইলভিত্তিক আর্থিক সেবার চাহিদা বাড়ছে।
বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে আরও উঠে এসেছে, আর্থিক সক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাসের অভাব অনেক মানুষকে ব্যাংক হিসাব খোলা থেকে বিরত রাখে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে অনেক সময় হিসাব থাকলেও তা পরিচালনার ক্ষেত্রে মানুষ অন্যের ওপর নির্ভরশীল থাকে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের বিস্তার আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট ডেটার উচ্চমূল্য এখনো অনেক মানুষের জন্য বড় প্রতিবন্ধকতা হিসেবে রয়ে গেছে।
-আফরিনা সুলতানা/










