চাঁদের মাটি জানাল ভিন্ন গল্প

চাঁদের মাটিতে সংরক্ষিত প্রাচীন তথ্য বিশ্লেষণ করে নাসার এক নতুন গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীর ইতিহাসের পরবর্তী সময়ে উল্কাপিণ্ডের মাধ্যমে যে পরিমাণ পানি এসেছে, তা পৃথিবীর মহাসাগরের মোট পানির তুলনায় খুবই সামান্য। ফলে “পরে এসে উল্কাপিণ্ডই পৃথিবীর পানির প্রধান উৎস” এই ধারণা নতুন করে প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

২৩ জানুয়ারি প্রকাশিত Proceedings of the National Academy of Sciences–এ ছাপা গবেষণায় নাসার জনসন স্পেস সেন্টার ও লুনার অ্যান্ড প্ল্যানেটারি ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা অ্যাপোলো মিশনে আনা চাঁদের ধুলো ও শিলা (রেগোলিথ) নতুন কৌশলে বিশ্লেষণ করেন। গবেষণার নেতৃত্ব দেন পোস্টডক্টরাল গবেষক টনি গারগানো।

চাঁদ কেন গুরুত্বপূর্ণ

পৃথিবীর ভূত্বক ও আবহাওয়ার কারণে প্রাচীন উল্কাপাতের অনেক চিহ্ন মুছে যায়। কিন্তু চাঁদের পৃষ্ঠ প্রায় অপরিবর্তিত থাকায় সেখানে কোটি কোটি বছরের সংঘর্ষের ইতিহাস জমা আছে। এই কারণেই চাঁদকে পৃথিবী–চাঁদ ব্যবস্থার “প্রাকৃতিক আর্কাইভ” বলা হয়।

নতুন পদ্ধতির সুবিধা

আগের গবেষণায় ধাতব উপাদান বিশ্লেষণের ওপর নির্ভর করা হতো, যা বহুবারের সংঘর্ষে বিকৃত হতে পারে। এবার বিজ্ঞানীরা ব্যবহার করেছেন ট্রিপল অক্সিজেন আইসোটোপ উচ্চ নির্ভুলতার রাসায়নিক ‘ফিঙ্গারপ্রিন্ট’। যেহেতু শিলায় অক্সিজেনের প্রভাব সংঘর্ষে বদলায় না, তাই এই পদ্ধতিতে উল্কাপিণ্ডের আসল গঠন সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাওয়া গেছে।

বিশ্লেষণে দেখা যায়, চাঁদের রেগোলিথের অন্তত প্রায় ১ শতাংশ ভর এসেছে কার্বনসমৃদ্ধ উল্কাপিণ্ড থেকে, যেগুলো আঘাতে আংশিকভাবে বাষ্পীভূত হয়েছিল। এসব উল্কাপিণ্ডের পরিচিত বৈশিষ্ট্য ধরে বিজ্ঞানীরা হিসাব করেন তাদের মাধ্যমে কতটা পানি আসতে পারত।

পৃথিবীর পানির হিসাব

চাঁদের তুলনায় পৃথিবীতে উল্কাপাতের হার অনেক বেশি হওয়ায় হিসাবকে প্রায় ২০ গুণ বাড়িয়ে পৃথিবীর জন্য প্রয়োগ করা হয়। তবু ফলাফল দেখায় চার বিলিয়ন বছর আগে থেকে উল্কাপিণ্ডে আসা পানি পৃথিবীর মহাসাগরের মোট পানির খুব ছোট একটি অংশ মাত্র। অর্থাৎ দেরিতে আসা উল্কাপিণ্ড পৃথিবীর পানির প্রধান যোগানদাতা ছিল এমন দাবি জোরালোভাবে সমর্থন পায় না।

গবেষকেরা বলেন, উল্কাপিণ্ডে পানি একেবারেই ছিল না এ কথা নয়; বরং চাঁদের দীর্ঘমেয়াদি রেকর্ড দেখায়, সেটি প্রধান উৎস হওয়া কঠিন।

চাঁদের জন্য এর মানে কী

পৃথিবীর তুলনায় চাঁদের পানির মজুদ খুব কম। তবে উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর স্থায়ী ছায়াযুক্ত অঞ্চলে জমে থাকা এই পানি বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও ভবিষ্যৎ মানব অভিযানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নাসার আর্টেমিস–৩ ও পরবর্তী মিশনে চাঁদে মানুষ নামলে এই অঞ্চলগুলো নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলতে পারে।

সামনে কী

এই গবেষণার নমুনা এসেছে চাঁদের নিরক্ষীয় অঞ্চলের কাছ থেকে যেখানে ছয়টি অ্যাপোলো মিশন অবতরণ করেছিল। অর্ধশতাব্দীর বেশি সময় পরও সেসব নমুনা নতুন তথ্য দিচ্ছে। তবে আর্টেমিস মিশনে ভিন্ন ভৌগোলিক অঞ্চল থেকে নমুনা এলে আগামী দশকগুলোতে আরও গভীর ধারণা পাওয়া যাবে বলে আশা বিজ্ঞানীদের।

টনি গারগানো বলেন, চাঁদের আসল মূল্য হলো এটি আমাদের হাতে “বাস্তব প্রমাণ” তুলে দেয়, যেগুলো ল্যাবে মেপে মহাকাশযানের পর্যবেক্ষণের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা যায়। আর্টেমিসের নমুনা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সৌরজগত সম্পর্কে নতুনভাবে ভাবতে শেখাবে।

সূত্র: নাসা (NASA)

সাবরিনা রিমি/