যুদ্ধ থামলেও থামেনি মৃত্যু, ভাইরাসে বিপর্যস্ত গাজা

ছবি : সংগৃহীত

প্রচণ্ড জ্বরে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া তিন মাস বয়সী শিশু শাথার মৃত্যু হয়েছে গাজায়। সন্তান হারানোর শোক সইতে না পেরে যমজ আরেক কন্যা নাদাকে বুকে জড়িয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা হিবা আবু জারাদ। ২০ জানুয়ারি গাজা নগরের একটি হাসপাতালে এ হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা যায়।

ফ্লুজনিত উপসর্গ নিয়ে আট বছর বয়সী কন্যা মরিয়মকে হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন মারওয়া কালুব। সাধারণ সর্দি-জ্বরে মেয়েটি সুস্থ হয়ে উঠবে—এমনটাই ভেবেছিলেন তিনি। কিন্তু হাসপাতাল থেকেই মরিয়মের নিথর দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হয় পরিবারকে।

৩৮ বছর বয়সী এই মা জানান, মেয়ের আগে কোনো জটিল শারীরিক সমস্যা ছিল না। স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ও সাধারণ ওষুধেই সে সেরে উঠবে বলে আশা করেছিলেন তিনি। কিন্তু পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যায়।

প্রায় দুই বছর ধরে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান চলমান। গত বছরের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হলেও হামলা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। একই সঙ্গে ত্রাণ প্রবেশে বাধার কারণে গাজার মানুষ মাসের পর মাস তীব্র খাদ্যসংকটে দিন কাটাচ্ছে।

দীর্ঘ অনাহারে বাসিন্দাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। যুদ্ধের ধাক্কায় ভেঙে পড়েছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাও। ফলে সাধারণ রোগও প্রাণঘাতী হয়ে উঠছে। মরিয়মের খালা ইমান কালুব বলেন, মারা যাওয়ার আগে মরিয়মের প্রচণ্ড কাশি, বমিভাব ও উচ্চমাত্রার জ্বর ছিল। সে খাবার গ্রহণ পুরোপুরি বন্ধ করে দিয়েছিল। গাজায় অনেকেই একই ধরনের ভাইরাসে আক্রান্ত হচ্ছেন। কিন্তু কেউ কল্পনাও করেনি, এভাবে মৃত্যু হবে।

কয়েক সপ্তাহ ধরে একটি রূপান্তরিত ভাইরাস গাজাজুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তবে পর্যাপ্ত পরীক্ষাগার সুবিধা ও চিকিৎসা সরঞ্জামের অভাবে এখনো ভাইরাসটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ।

১১ জানুয়ারি মরিয়মকে রানতিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। একসময় এটি কিডনি ও ক্যানসারে আক্রান্ত শিশুদের প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্র ছিল। ইসরায়েলি হামলায় স্বাস্থ্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এখন সেখানে মূলত শ্বাসনালি ও অন্ত্রজনিত সংক্রমণের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

হাসপাতালে রোগীর চাপ এত বেশি ছিল যে শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ দেখাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয় বলে জানান ইমান কালুব। চিকিৎসকেরা জানান, মরিয়মের ফুসফুস মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত শুধু অক্সিজেন দেওয়া সম্ভব হয়, স্যালাইন দেওয়ার সুযোগও ছিল না।

অক্টোবরে যুদ্ধবিরতির পর পরিবারটি নতুন করে স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখেছিল। বাড়ি মেরামত করা হচ্ছিল, মরিয়ম স্কুলে যাওয়া শুরু করেছিল। কিন্তু দুই বছরের বোমাবর্ষণে বেঁচে যাওয়া শিশুটি শেষ পর্যন্ত একটি ভাইরাসে মারা গেল—যা পরিবারটি মেনে নিতে পারছে না।

গাজা নগরের আল-শিফা মেডিকেল কমপ্লেক্সের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সালমিয়া বলেন, অবরোধের কারণে গাজা নজিরবিহীন মানবিক ও স্বাস্থ্য সংকটে পড়েছে। এমন কোনো পরিবার নেই, যেখানে কেউ না কেউ এই রোগে আক্রান্ত হয়নি। তার ধারণা, ভাইরাসটি ইনফ্লুয়েঞ্জার রূপান্তরিত ধরন অথবা কোভিড-১৯–এর কোনো ভ্যারিয়েন্ট হতে পারে। জরুরি রোগী ভর্তি ২০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। অধিকাংশ রোগী শ্বাসনালির সংক্রমণ, উচ্চ জ্বর, ওজন হ্রাস ও জয়েন্টের ব্যথায় ভুগছেন।

গুরুতর নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে হাজারো মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। কিছু রোগীকে আইসিইউতে রাখতে হয়েছে। মৃত্যুর খবরও পাওয়া যাচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজার অধিকাংশ চিকিৎসাকেন্দ্র পূর্ণ সেবা দিতে অক্ষম। জরুরি ওষুধের ৫৫ শতাংশের সরবরাহ নেই, আর মৌলিক চিকিৎসা সরঞ্জামের মজুত প্রায় ৭১ শতাংশ শেষ হয়ে গেছে।

আবু সালমিয়া বলেন, পর্যাপ্ত ওষুধ ও পরীক্ষার সরঞ্জাম না থাকায় রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাস্তুচ্যুত মানুষের ভিড়, দূষিত পানি, ছেঁড়া তাঁবু এবং অপুষ্টিই সংক্রমণ দ্রুত ছড়ানোর প্রধান কারণ।

তিনি বলেন, শিশু, বয়স্ক, অন্তঃসত্ত্বা নারী ও দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সবচেয়ে ঝুঁকিতে রয়েছেন। অনাহার ও অপুষ্টি রোগ প্রতিরোধক্ষমতা ভেঙে দিয়েছে। ফলে অনেক মৃত্যু ঘটছে, যেগুলো প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল।