জ্ঞানের দেবী সরস্বতীর পূজা

শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি আর ঢাকের বাদ্যে আজ ভোরে সূচিত হয়েছে দেবী সরস্বতীর আবাহন। শ্বেতশুভ্র বসন পরিহিতা, হাতে বীণা ও বেদ ধারণ করা জ্ঞানদাত্রী দেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি দিতে সকাল থেকেই মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ভিড় জমিয়েছেন ভক্তরা, বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা। বিদ্যা দেবীর কৃপা লাভের আশায় হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা আজ পালন করছেন এই বিশেষ উৎসব।
সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু সম্প্রদায়কে আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। এক বাণীতে তিনি বলেন, “বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। হাজার বছর ধরে এ দেশে সব ধর্মের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের সঙ্গে মিলেমিশে বসবাস করে আসছেন। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে বাংলাদেশ সবার জন্য এক নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ আবাসভূমি।”
রাজধানীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রামকৃষ্ণ মিশনসহ সারা দেশের বিভিন্ন মণ্ডপে আজ সকাল থেকেই পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়েছে। শাস্ত্রানুসারে, শ্রীপঞ্চমীর এই পুণ্য তিথিতে দেবী সরস্বতী মর্ত্যে অবতীর্ণ হন। জ্ঞান ও শিল্পের প্রসারে দেবীর আশীর্বাদ কামনায় ছোট শিশুদের হাতেখড়ি দেওয়া হয় আজকের এই বিশেষ দিনে।
সরস্বতী পূজার ইতিহাস ও উৎপত্তির পেছনে রয়েছে ধর্মীয় ও পৌরাণিক গভীর তাৎপর্য। হিন্দু ধর্মশাস্ত্র ও পুরাণ অনুযায়ী এর প্রেক্ষাপট নিচে তুলে ধরা হলো: পৌরাণিক কাহিনী মতে, সৃষ্টির দেবতা ব্রহ্মা যখন এই মহাবিশ্ব সৃষ্টি করলেন, তখন সবকিছুই ছিল নিস্তব্ধ ও নীরব। সৃষ্টির মধ্যে কোনো সুর বা প্রাণস্পন্দন অনুভব করতে না পেরে ব্রহ্মা চিন্তিত হয়ে পড়েন। তখন তিনি তাঁর কমণ্ডলু থেকে জল ছিটিয়ে এক জ্যোতির্ময়ী দেবীর আবাহন করেন। সেই দেবীই হলেন সরস্বতী। তিনি আবির্ভূত হয়ে যখন তাঁর বীণায় সুর তুললেন, তখন এই পৃথিবী শব্দ ও প্রাণের ছন্দে মুখরিত হয়ে ওঠে। সেই থেকে তিনি শব্দ, ভাষা এবং সংগীতের দেবী হিসেবে পূজিত হন।
সরস্বতী শব্দের অর্থ হলো ‘সরস’ বা ‘জলীয়’। ঋগ্বেদে তিনি একটি পবিত্র নদীর দেবী হিসেবেও পরিচিত ছিলেন। পরবর্তীতে নদী থেকে তিনি বুদ্ধিবৃত্তি ও জ্ঞানের প্রতীকে রূপান্তরিত হন। মানুষের ভেতরের অজ্ঞানতা দূর করে সত্য ও ন্যায়ের পথ দেখাতেই তাঁর এই পূজা করা হয়।
মাঘ মাসের এই তিথিকে ‘বসন্ত পঞ্চমী’ বলা হয়। সরস্বতী পূজা মূলত বসন্তের আগমনের এক আনন্দময় উৎসব। প্রকৃতির রুক্ষতা কাটিয়ে নতুন প্রাণের সঞ্চার এবং মনের জড়তা কাটিয়ে জ্ঞানের আলোকবর্তিকা প্রজ্বলিত করাই এই পূজার মূল দর্শন।
লামিয়া আক্তার