সিরিয়া থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের চিন্তা ওয়াশিংটনের, এসডিএফ ভাঙনের মুখে

২০ জানুয়ারি ২০২৬, সিরিয়ার হাসাকাহ শহরে জড়ো হতে দেখা যায় সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ)-এর সদস্যদের। (ছবি: ওরহান কেরেমান/রয়টার্স)

সিরিয়ায় মার্কিন সেনা উপস্থিতি পুরোপুরি প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নতুন করে বিবেচনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। উত্তর সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্র–সমর্থিত কুর্দি নেতৃত্বাধীন বাহিনী সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস (এসডিএফ) ভেঙে পড়লে সেখানে মার্কিন সেনা রাখার আর প্রয়োজন থাকবে না এমন মূল্যায়নের কথা জানিয়েছে ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল (ডব্লিউএসজে)।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সিরিয়ার নতুন সরকার উত্তরাঞ্চলে এসডিএফ ভেঙে দিতে সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। এই উদ্যোগ দেশটির প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারারার কৌশলের অংশ, যার লক্ষ্য ১৪ বছরব্যাপী গৃহযুদ্ধের সময় গড়ে ওঠা বিভিন্ন মিলিশিয়াকে নিরস্ত্র করে তাদের জাতীয় সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা।

ডব্লিউএসজে–কে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, এসডিএফ ভেঙে গেলে সিরিয়ায় অবস্থানরত ৮০০ থেকে ১,০০০ মার্কিন সেনার আর সেখানে থাকার যৌক্তিকতা থাকবে না। তবে তারা আরও বলেন, সিরিয়ান সেনাবাহিনীর সঙ্গে সহযোগিতা সম্ভব নয়, কারণ সেখানে ‘জিহাদপন্থী সহানুভূতিশীল’ ব্যক্তি রয়েছেন এবং কুর্দি ও দ্রুজ সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে।

একসময় ইসলামিক স্টেট (আইএস) বিরোধী লড়াইয়ে এসডিএফ ছিল সবচেয়ে কার্যকর শক্তি। কিন্তু তুরস্ক, যারা শারারার ক্ষমতায় আসার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে, তারা এসডিএফকে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (পিকেকে)-এর শাখা হিসেবে দেখে। পিকেকে তুরস্ক ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের কাছেই একটি সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত।

এদিকে এসডিএফ ও সিরিয়ান সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষে মার্কিন সেনারাও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। গত ডিসেম্বরে সিরিয়ান সেনাবাহিনীর এক সদস্য যিনি ইসলামিক স্টেটের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে ধারণা করা হয় তিনজন মার্কিন সেনাকে হত্যা করে।

আইএস বন্দিদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত

এসডিএফ দুর্বল হয়ে পড়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন বন্দিশিবিরগুলোর নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে। এসব শিবিরে প্রায় ৭ হাজার ইসলামিক স্টেট–সংশ্লিষ্ট বন্দি রয়েছে, যাদের মধ্যে নারী ও শিশুও আছে। অনেক দেশের সরকার তাদের নাগরিকদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে। এসব বন্দিকে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযুক্ত করা হয়নি বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় আনা হয়নি।

এই বন্দিরা অন্তত ৫০টি দেশের নাগরিক, যার মধ্যে রয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, জার্মানি, বেলজিয়াম, সুইডেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, মিসর, তিউনিসিয়া ও ইরাক।

পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) সিরিয়া থেকে ১৫০ জন আইএস বন্দিকে ইরাকে স্থানান্তর শুরু করেছে। সেন্টকম জানিয়েছে, ধাপে ধাপে সব বন্দিকেই সিরিয়া থেকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক বিবৃতিতে বলেন, “উত্তর-পূর্ব সিরিয়ায় সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রেক্ষাপটে আইএস সন্ত্রাসীদের নিরাপদ স্থাপনায় আটক রাখতে ইরাক সরকারের উদ্যোগকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাগত জানায়।” তিনি আরও বলেন, “অ-ইরাকি সন্ত্রাসীরা সাময়িকভাবে ইরাকে থাকবে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর উচিত নিজেদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে বিচার নিশ্চিত করা।”

তবে সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা ও ওবামা ও প্রথম ট্রাম্প প্রশাসনের কাউন্টার-আইএস কৌশলের মুখ্য ব্যক্তি ব্রেট ম্যাকগার্ক এই নীতিগত পরিবর্তনের সমালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, “উত্তর-পূর্ব সিরিয়ার পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের। যুদ্ধবিরতি অবশ্যই বজায় রাখতে হবে। বিশেষ করে আইএস বন্দিশিবিরে নিরাপত্তা ভেঙে পড়লে তা আন্তর্জাতিক পরিণতি ডেকে আনবে।”

এসডিএফের সম্ভাব্য পতন বিশ্বজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। এরই মধ্যে ২০ জানুয়ারি তুরস্কে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ও সিরিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত টম ব্যারাক বলেন, “মাঠে আইএসবিরোধী প্রধান শক্তি হিসেবে এসডিএফের মূল ভূমিকা অনেকটাই শেষ হয়ে এসেছে।”

সূত্র: মিডল ইস্ট আই

সাবরিনা রিমি/