জনগণের মতামতের প্রতিফলন ঘটবে এমন নির্বাচন চাই : জামায়াত আমির

জনগণের মতামতের প্রকৃত প্রতিফলন ঘটবে এমন শান্তিপূর্ণ, ভয়ভীতিমুক্ত ও সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান। তিনি বলেছেন, ‘আমরা একটি শান্তিপূর্ণ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চাই, যেখানে কোনো ভয়ভীতির পরিবেশ থাকবে না। জনগণ যেন নির্বিঘেœ তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারে- এমন নির্বাচনই আমরা প্রত্যাশা করি।’

মঙ্গলবার ঢাকা-১৫ আসন (মিরপুর-কাফরুল) এলাকার পীরেরবাগে নির্বাচনী কার্যক্রম চলাকালে সন্ত্রাসী হামলায় আহত জামায়াতের নেতাকর্মীদের গতকাল বুধবার ইবনে সিনা হাসপাতালে দেখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।

ডা: শফিকুর রহমান জানান, পীরেরবাগে হামলার ঘটনায় আহত অন্তত ২৫ জন বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখানে যারা আহত হয়েছেন, তারা চিকিৎসা নিচ্ছেন। আমরা তাদের দেখতে এসেছি। প্রশ্ন হচ্ছে-নির্বাচনী প্রচারণা আনুষ্ঠানিকভাবে আগামীকাল (২২ জানুয়ারি) শুরু হওয়ার কথা, তার আগেই কেন এ ধরনের সহিংসতা ঘটছে?’

মব সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা : নির্বাচনী আচরণবিধি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, ‘আমাদের কেউ যদি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রয়েছে। নির্বাচন কমিশন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে, আমাদের সতর্ক করবে, আমাদের কাছে ব্যাখ্যা চাইবে। কিন্তু কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের কোনো এখতিয়ার নেই নিজেরা আইন হাতে তুলে নিয়ে মব তৈরি করার।’ তিনি মব সংস্কৃতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা চাই এই মব এখানেই শেষ হোক। মনে রাখতে হবে, দুনিয়ার মানুষ এখন অনেক সচেতন। মব সৃষ্টি করে জনমত প্রভাবিত করার দিন শেষ।’

জনগণই চূড়ান্ত বিচারক : ডা: শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী সব রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের জনগণের সামনে নিজেদের অবস্থান পরিষ্কারভাবে তুলে ধরা উচিত। ‘সবাই জনগণের কাছে নিজের বক্তব্য, দলের অঙ্গীকার, নিজের চরিত্র ও অতীত-বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে হাজির হবে। জনগণই বিবেচনা করবে ভবিষ্যতে কাকে তারা বিশ্বাস করবে, কাকে ক্ষমতা দেবে।’ তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামীর অঙ্গীকার স্পষ্ট- ‘আমরা একটি দুর্নীতি ও দুঃশাসনমুক্ত, ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গড়তে চাই। এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা চাই, যেখানে ফ্যাসিজম আর কখনো ফিরে আসবে না।’

জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট : জামায়াত আমির জানান, দলটি একসাথে দু’টি নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে চায়। ‘আমরা একটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং একই সাথে একটি গণভোটে অংশগ্রহণ করব,’ বলেন তিনি। জাতীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে ডা: শফিকুর রহমান বলেন, ‘৩০০ আসনে যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন, তাদের সবাইকে বলব- জনগণের ওপর আস্থা রাখুন। জনগণ যেন শান্তিপূর্ণভাবে তার ভোট পছন্দের প্রতীকে এবং ব্যালট বাক্সে দিতে পারে, সেই সুযোগ নিশ্চিত করুন।’

তিনি বলেন, ‘যিনি নির্বাচিত হয়ে আসবেন, তাকে অভিনন্দন জানানো এবং সহযোগিতা করা সব রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব। কিন্তু এখনই যদি সেই সাড়ে পনেরো বছরের পুরনো কায়দায় নির্বাচনী মাঠ উল্টোপাল্টা করার চেষ্টা করা হয়, তাহলে জাগ্রত যুবসমাজ তা ক্ষমা করবে না।’

ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত তরুণ সমাজ : ডা: শফিকুর রহমান বলেন, সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনে যুবসমাজ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ‘যুবকরা বুকের রক্ত দিয়ে পরিবর্তন এনেছে। দেশবাসী তাদের পাশে ছিল, নেতৃত্ব দিয়েছে তারাই। যেসব যুবক-যুবতী নেতৃত্ব দিয়েছে, তাদের অনেকের বয়স এখন ৩০-৩৫ বছর। অথচ ১৮ বছর বয়সে ভোটাধিকার পেলেও তারা আজ পর্যন্ত প্রকৃত অর্থে ভোট দিতে পারেনি।’ তিনি বলেন, ‘একজন নাগরিকের সবচেয়ে বড় অধিকার হলো ভোটাধিকার। সেই অধিকারই দীর্ঘদিন ধরে কেড়ে নেয়া হয়েছে। এবারো যদি কেউ ‘আমার ভোট আমি দেব, তোমার ভোটও আমি দেব’- এই স্লোগান নিয়ে মাঠে নামে, তাহলে যুবসমাজ ব্যালটের মাধ্যমেই তার জবাব দেবে।’

নারীকর্মীদের ওপর হামলার নিন্দা : নারী ও পুরুষ কর্মীদের ওপর হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে জামায়াত আমির বলেন, ‘যারা আমাদের ভাইদের গায়ে হাত তুলেছে, আমাদের মায়েদের গায়ে হাত তুলেছে, আমরা তাদের তীব্র নিন্দা জানাই। তারা কি মায়ের পেট থেকে জন্ম নেয়নি? তাদের কি ঘরে মা-বোন নেই?’

তিনি বলেন, ‘মা-বোনদের প্রতি ন্যূনতম সম্মান দেখানো নিশ্চয়ই তারা পরিবার থেকেই শিখেছে। যদি না শিখে থাকে, তাহলে সেটি দুর্ভাগ্যজনক।’

নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি আহ্বান : ডা: শফিকুর রহমান বলেন, শুধু ঢাকা-১৫ নয়, দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিচ্ছিন্নভাবে এ ধরনের ঘটনার খবর পাওয়া যাচ্ছে। তিনি নির্বাচন কমিশন ও সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আপনারা যদি সত্যিই সুষ্ঠু নির্বাচনের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করতে চান, তাহলে আপনাদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। সবার জন্য সমতল মাঠ নিশ্চিত করতে হবে, সবাইকে সমান সুযোগ দিতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘যারা সন্ত্রাস ও দুর্বৃত্তপনায় জড়িত, তাদের রাজনৈতিক পরিচয়ের দিকে না তাকিয়ে আইনের আওতায় আনতে হবে। দায়িত্বের জায়গা থেকে কঠোর ব্যবস্থা নিলে তবেই একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব হবে।’

-সাইমুন