ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার আজ বৃহস্পতিবার শুরু হচ্ছে। তপশিল ঘোষণার পর এক মাসেরও বেশি সময়ে নানা আনুষ্ঠানিকতা শেষে প্রতীক পেয়ে এ দিন থেকেই মূলত ভোটের লড়াইয়ে মাঠে নামছেন প্রার্থীরা। প্রচার শুরুর আগেই সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্বাচনী আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার নির্দেশনা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। যদিও নির্বাচনকে ঘিরে আগেই আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপক অভিযোগ এসেছে। সারাদেশ থেকে প্রার্থীদের সতর্ক করে শোকজ নোটিশ ও জরিমানার ঘটনাও ঘটেছে।
তপশিল অনুযায়ী, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণ করা হবে। এর আগে ২১ দিন নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণার সুযোগ পাবেন প্রার্থীরা। আজ বৃহস্পতিবার থেকে প্রচার শুরু হয়ে আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত চলবে। অর্থাৎ ভোটগ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত প্রচারণা চালানো যাবে।
এর আগে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের পর মঙ্গলবার মধ্যরাতে ইসি থেকে ২৯৮ আসনে এক হাজার ৯৬৭ জন বৈধ প্রার্থী রয়েছেন বলে জানানো হয়। তবে বুধবার সংশোধিত তালিকা প্রকাশ করে ইসি জানায়, প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ৫ জন বেড়ে এক হাজার ৯৭২ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ১৫ জন প্রার্থী আছেন ঢাকা-১২ আসনে। সর্বনিম্ন প্রার্থী রয়েছে পিরোজপুর-১ আসনে ২ জন।
শেষ হলো প্রতীক বরাদ্দ
বুধবার সারাদেশে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়গুলোতে একযোগে শুরু হয় প্রতীক বরাদ্দের কার্যক্রম। রিটার্নিং কর্মকর্তারা দলীয় ও স্বতন্ত্র প্রার্থী অথবা তাদের প্রতিনিধিদের হাতে প্রতীক বরাদ্দের চিঠি তুলে দেন। দলীয় প্রার্থীদের প্রতীক সংরক্ষিত ও আগেই জানা থাকায় স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কে কোন প্রতীক পেলেন, সেটি নিয়েই বেশি কৌতূহল দেখা দেয়। পছন্দের প্রতীক পেয়ে বেশির ভাগ স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন উচ্ছ্বসিত। তবে কোনো কোনো আসনে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী একই প্রতীক পছন্দ করলে রিটার্নিং কর্মকর্তারা আলোচনার মাধ্যমে প্রতীক বরাদ্দ দেন।
প্রতীক গ্রহণকালে প্রার্থীদের আচরণ বিধিমালা মেনে চলার লিখিত অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর দিতে হয়। রিটার্নিং কর্মকর্তারা তাদের বক্তব্যে সব প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলকে আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার তাগিদ দেন। প্রতীক বরাদ্দকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা মোতায়েন ছিল রিটার্নিং কর্মকর্তাদের কার্যালয়গুলোতে।
কোন দলের কতজন প্রার্থী
ইসির নিবন্ধিত দলের সংখ্যা ৬০টি। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম ও নিবন্ধন স্থগিত আছে। আর ৮টি দল প্রার্থী না দেওয়ায় ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যা ৫১টিতে দাঁড়ায়। সর্বশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে ৩৮টি দল অংশ নিয়েছিল।
নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৫১টি দলের মধ্যে বিএনপির ২৮৮ প্রার্থী দলীয় প্রতীক ‘ধানের শীষ’ বরাদ্দ পান। জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের প্রার্থী ২২৫ জন। চরমোনাইর পীরের দল ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ‘হাতপাখা’ প্রতীকের প্রার্থী ২৫৯, জাতীয় পার্টির ‘লাঙ্গল’ প্রতীকের ১৯৬ প্রার্থী, গণঅধিকার পরিষদের ‘ট্রাক’ প্রতীকের ৯২ প্রার্থী, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) ‘কাস্তে’ মার্কার ৬৩ প্রার্থী, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) ‘মই’ প্রতীকের ৩৭ প্রার্থী, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ‘তারা’ মার্কার ৩১ প্রার্থী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) ‘শাপলা কলি’ প্রতীকের ৩০ প্রার্থী, গণসংহতি আন্দোলনের ‘মাথাল’ প্রতীকের ১৭ প্রার্থী, নাগরিক ঐক্যের ‘কেটলি’ প্রতীকের ১২ প্রার্থী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের ‘রিকশা’ প্রতীকের ২৯ প্রার্থী, খেলাফত মজলিসের ‘ঘড়ি’ মার্কার ১৪ প্রার্থী, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ‘কোদাল’ প্রতীকের ৭ প্রার্থী, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) ‘ছাতা’ প্রতীকের ৭ প্রার্থী, আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) ‘ঈগল’ প্রতীকের ৫ প্রার্থী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলামী পার্টির ‘বই’ মার্কার ৩ প্রার্থী এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) ২ প্রার্থী ‘ফুলকপি’ প্রতীকে লড়বেন।
এছাড়া বাংলাদেশ জাসদের প্রার্থীরা ‘মোটরগাড়ি’, আমজনতার দলের প্রার্থীরা ‘প্রজাপতি’, ইনসানিয়াত বিপ্লবের প্রার্থীরা ‘আপেল’, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টির প্রার্থীরা ‘রকেট’, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ ‘হারিকেন’,
জনতার দল ‘কলম’ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি ‘একতারা’-সহ অন্য দলের প্রার্থীরা নিজ নিজ দলীয় প্রতীকে লড়ছেন।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতীক
ইসির প্রতীক তালিকার ১১৯টি থেকে দলীয় ৬০টি বাদে অন্য প্রতীকগুলো স্বতন্ত্র প্রার্থীদের জন্য বরাদ্দ করা হয়। এতে ফুটবল, হাঁস, কলস, ঘুড়ি ইত্যাদি প্রতীক বরাদ্দ পান তারা।
স্বতন্ত্র প্রার্থীদের মধ্যে আলোচিত ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা পেয়েছেন ‘হাঁস’ প্রতীক। ঢাকা-১২ আসনে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সাইফুল ইসলাম নীরবকে ‘ফুটবল’ প্রতীক দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-৯ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও এনসিপি থেকে পদত্যাগ করা ডা. তাসনিম জারা প্রতীক পেয়েছেন ‘ফুটবল’।
কী করা যাবে, কী করা যাবে না
রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০২৫-এ ভোটের প্রচারে পোস্টারের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব প্রচারণার লক্ষ্যে রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক, পিভিসি বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি লিফলেট, হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন বা ব্যানার ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। প্রচারের সময় মাইকের শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে।
একইসঙ্গে প্রচারে বিলবোর্ডের ব্যবহার সীমিত করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে একজন প্রার্থী এক সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন না। বিলবোর্ডের দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। এছাড়া বিলবোর্ড স্থাপনের মাধ্যমে কোনোভাবেই জনসাধারণ বা যানবাহন চলাচল এবং পরিবেশ বা নিরাপত্তা বিঘ্নিত করা যাবে না। শুধু ডিজিটাল বিলবোর্ডে আলোর ব্যবহার করা যাবে। এর বাইরে সব ধরনের আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
আচরণ বিধিমালায় সামাজিক মাধ্যমে ভোটের প্রচারেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। এতে বলা হয়–প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচনসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করা যাবে না। ঘৃণাসূচক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারও চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচনসংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না। প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাসূচক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উস্কানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। এছাড়া নির্বাচনী স্বার্থ হাসিলের জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না। এমন ধরনের সব কনটেন্ট সামাজিক মাধ্যমে শেয়ার ও প্রকাশের আগে সত্যতা যাচাই করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে। গুজব ও এআইর অপব্যবহার বন্ধে অপরাধ বিবেচনায় শাস্তির বিধান রেখে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) এবার নতুন ধারা যুক্ত করা হয়।
আচরণবিধিতে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তাঁর পক্ষে ভোটার স্লিপ বিতরণ করা যাবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করা যাবে না। এছাড়া আচরণ বিধিমালায় সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ও উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না।
আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্তসাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।
তবুও আচরণবিধির লঙ্ঘন দেদার
ইসির এত কড়াকড়ি থাকার পরও গত কয়েকদিনে দেশে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। সারাদেশে থেকে প্রায় অর্ধশত অভিযোগ এসেছে বলে জানিয়েছে ইসি। এসব কারণে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ অনেক দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও শোকজ বা জরিমানা করা হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে প্রতীকসহ পোস্ট বা লিফলেট বিতরণের অভিযোগে কিছু এলাকায় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় বিএনপির অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি জামায়াতে ইসলামী, এনসিপিসহ চার দলকে চিঠি দিয়ে সতর্ক করেছে। খোদ নির্বাচন কমিশনের সামনে লিফলেট বিতরণ করার পাশাপাশি ভোট চান ঢাকা-১৩ আসনে বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মামুনুল হক। পরে তাঁকে শোকজ করা হয়। এছাড়া ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এবং ঢাকা-৮ আসনের প্রার্থী এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটওয়ারীকে শোকজ করা হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী ও বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত রুমিন ফারহানার বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের পাশাপাশি ‘মব’ সৃষ্টির অভিযোগ করা হয়েছে। এছাড়া অনেক প্রার্থীকে জরিমানাও করা হয়েছে।
মাঠের এমন পরিস্থিতিতে কঠোরতার বদলে সবার সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। একাধিক অনুষ্ঠানে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আচরণবিধি সঠিকভাবে পালন করা হলে নির্বাচন সুন্দরভাবে হবে। এ জন্য আপনাদের সহযোগিতা অত্যন্ত জরুরি।’
-সাইমুন










