সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামো কার্যকর হলে প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, এই বাড়তি ব্যয়ের দায় ভবিষ্যৎ সরকারের ওপর বর্তাবে এবং অর্থের সংস্থানও সরকারকেই খুঁজে বের করতে হবে। তাঁর মতে, নতুন বেতন কাঠামো দীর্ঘদিন ধরেই প্রয়োজনীয় ছিল। তবে পরবর্তী নির্বাচিত সরকার চাইলে এটি বাস্তবায়ন নাও করতে পারে।
মঙ্গলবার অর্থ মন্ত্রণালয়ে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। অর্থ উপদেষ্টা জানান, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন ও ভাতা নির্ধারণে গঠিত পে কমিশন বুধবার বিকেল ৫টায় তাদের প্রতিবেদন জমা দেবে। কমিশনের চেয়ারম্যান জাকির আহমেদ খান কমিশনের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে প্রতিবেদনটি হস্তান্তর করবেন। এ সময় অর্থ উপদেষ্টা ও অর্থ সচিব উপস্থিত থাকবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে আর মাত্র ২০ দিন সময় রয়েছে। এই সময়ের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন সম্ভব কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী বাস্তবায়ন সরকারের নিয়ম-কানুন মেনেই হবে। তিনি জানান, পে কমিশনের প্রস্তাব হুবহু কার্যকর করা হয় না। এ জন্য একাধিক কমিটি রয়েছে, যারা প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করবে।
তিনি আরও বলেন, এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে সাধারণত তিন থেকে চার মাস সময় লাগে। ফলে বর্তমান সরকার পুরো কাঠামো বাস্তবায়ন করতে পারবে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলেননি। তবে প্রতিবেদনের সুপারিশ জমা দেওয়াটাকেই তিনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেন।
বর্তমানে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা বাবদ বছরে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। পে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী নতুন বেতন কাঠামো সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন হলে এ খাতে আরও প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত প্রয়োজন হবে।
দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিকভাবে কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে। আর পুরো কাঠামো বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে, অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে।
সূত্র অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি চাকরিজীবীদের সর্বনিম্ন বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। অপরদিকে সর্বোচ্চ ধাপে বর্তমানে বেতন ৭৮ হাজার টাকা হলেও তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার প্রস্তাব রয়েছে। সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশও করা হয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন ও ভাতা খাতে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ হিসেবেই এই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। পে কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, পুরো কাঠামো বাস্তবায়নে অতিরিক্ত ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। প্রস্তাবিত কাঠামোয় নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ও ভাতা তুলনামূলকভাবে বেশি বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।
গত বছরের ২৭ জুলাই সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতন কাঠামো প্রণয়নের লক্ষ্যে পে কমিশন গঠন করা হয়। বর্তমানে ২০১৫ সালের পে স্কেল অনুযায়ী প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী বেতন ও ভাতা পাচ্ছেন। সামরিক বাহিনী, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকসহ মোট উপকারভোগীর সংখ্যা প্রায় ২৪ লাখ।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে মহার্ঘ ভাতা নিয়ে আলোচনা শুরু হলেও পরে তা স্থগিত করা হয়। তবে গত জুলাই থেকে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বিশেষ সুবিধা ঘোষণা করা হয়েছে। পাশাপাশি ২০১৫ সালের জুলাই থেকে প্রতিবছর ৫ শতাংশ হারে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট চালু রয়েছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সন্তুষ্ট হবেন বলে তিনি আশাবাদী। পে কমিশনের চেয়ারম্যানও জানিয়েছেন, কমিশন বাস্তবসম্মতভাবে কাজ করেছে।
তিনি বলেন, দেশের আর্থিক সক্ষমতা, সম্পদের সীমাবদ্ধতা এবং বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে যতটা সম্ভব যুক্তিসংগত সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় এবং মূল্যস্ফীতির বিষয়গুলোও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়েছে।
বেতন বাড়লে বাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না—এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এর কোনো বিরূপ প্রভাব পড়বে না। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বেতন বৃদ্ধি কোনো প্রভাব ফেলবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এর সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই।
অর্থ উপদেষ্টা আরও জানান, আগামী ২৭ জানুয়ারি করনীতি সংক্রান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেবে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান। ভবিষ্যতের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং নতুন বেতন কাঠামো বাস্তবায়নের পথনির্দেশ এই প্রতিবেদনের ওপর অনেকটাই নির্ভর করবে।
-আফরিনা সুলতানা/










