ডোনাল্ড ট্রাম্প আত্মপ্রচারের রাজনীতিতে বরাবরই আলাদা পরিচিতি গড়ে তুলেছেন। বাস্তবতা ও অতিরঞ্জনের সীমারেখা ঝাপসা করে নিজের সক্ষমতা তুলে ধরতে তিনি এমন ভাষা ব্যবহার করেন, যা অনেক সময় তার সমর্থক ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্য মনে হয়।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ নিয়ে তার বক্তব্য সেই প্রবণতারই বড় উদাহরণ। ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই ট্রাম্প দাবি করে আসছেন—তিনি ক্ষমতায় থাকলে এই সংঘাতের জন্মই হতো না। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি আরও এক ধাপ এগিয়ে বলেন, চাইলে আলোচনার মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই যুদ্ধ থামিয়ে দিতে পারবেন।
পরবর্তী সময়েও এই বক্তব্য বিভিন্ন সভা ও সাক্ষাৎকারে বারবার শোনা গেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে সিএনএনের এক অনুষ্ঠানে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধ বন্ধ করাই তার লক্ষ্য এবং তিনি একদিনেই তা করে দেখাতে পারবেন। ২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারে তিনি আবারও জানান, যুদ্ধ থামানোর জন্য তার কাছে একটি ‘স্পষ্ট পরিকল্পনা’ রয়েছে, যদিও সেটির বিস্তারিত তিনি প্রকাশ করেননি।
সিএনএনের ফ্যাক্টচেক অনুযায়ী, ২০২৩ ও ২০২৪ সালের প্রচারপর্বে ট্রাম্প অন্তত ৫৩ বার প্রকাশ্যে বলেছেন—তিনি ক্ষমতায় এলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুদ্ধ শেষ করবেন। তখনই বিশ্লেষকেরা মন্তব্য করেছিলেন, এটি বাস্তবতার চেয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের অংশ বেশি।
২০২৪ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করাই হবে তার প্রথম অগ্রাধিকার। কিন্তু দ্বিতীয় দফায় হোয়াইট হাউসে ফেরার এক বছর পেরিয়ে গেলেও সেই প্রতিশ্রুতির বাস্তব কোনো ফল দেখা যায়নি।
ইউক্রেন ইস্যুতে বিশেষ দূত হিসেবে তিনি নিয়োগ দেন কেইথ কেলগকে, যিনি ১০০ দিনের মধ্যে সমাধানের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছিলেন। নির্ধারিত সময় পার হলেও যুদ্ধ থামেনি।
২০২৫ সালের এপ্রিলে এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্পকে তার ‘প্রথম দিনের’ প্রতিশ্রুতি নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, বিষয়টি তিনি খুব ‘গুরুত্ব দিয়ে’ বলেননি। তবে অতীতের দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী বক্তব্যগুলো এই ব্যাখ্যাকে বিতর্কিত করে তোলে।
পরবর্তীতে ট্রাম্প যুদ্ধ বন্ধ না হওয়ার জন্য রাশিয়া ও ইউক্রেনের নেতৃত্বের পারস্পরিক গভীর শত্রুতাকে দায়ী করেন। কখনো তিনি রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে দোষারোপ করেন, আবার কখনো ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সমালোচনা করেন।
তবে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা থামাননি তিনি। পুতিন ও জেলেনস্কি—দুপক্ষের সঙ্গেই যোগাযোগ রেখে ট্রাম্প বর্তমানে একটি ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনা এগিয়ে নিচ্ছেন। গত বছরের ডিসেম্বরে ফ্লোরিডায় ট্রাম্প ও জেলেনস্কির বৈঠকের পর ইউক্রেন জানায়, প্রস্তাবের প্রায় ৯০ শতাংশ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে এবং নিরাপত্তা নিশ্চয়তা নিয়েও অগ্রগতি রয়েছে।
তবু রাশিয়ার কঠোর শর্ত শান্তিচুক্তির প্রধান বাধা হয়ে আছে। মস্কো দনবাস অঞ্চল পুরোপুরি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে চায় এবং ইউক্রেনের ন্যাটো সদস্যপদকে অগ্রহণযোগ্য বলে মনে করে। ট্রাম্পও ইউক্রেনের ন্যাটোতে যোগদানের বিরোধিতা করেছেন। প্রস্তাবিত কাঠামোয় দনবাস রাশিয়ার হাতে দেওয়ার কথা থাকলেও কিয়েভ তা প্রত্যাখ্যান করেছে।
জেলেনস্কির ভাষায়, ইউক্রেন শান্তি চায়, কিন্তু নিজের সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়ে নয়। এই পরিস্থিতিতে কিয়েভভিত্তিক এক বিশ্লেষক আলজাজিরাকে বলেন, যুদ্ধক্ষেত্রে অগ্রগতি থেমে গেলে এবং রাশিয়া যদি বুঝতে পারে যে ইউক্রেন দীর্ঘমেয়াদি লড়াই চালিয়ে যেতে সক্ষম, তখনই সমঝোতার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। তার মতে, ২০২৬ সালের শেষ দিকে শান্তিচুক্তির সুযোগ তৈরি হতে পারে, নচেৎ যুদ্ধ ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়াতে পারে।
২০২২ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া এই যুদ্ধ এখন চার বছরে পা দিতে চলেছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড বর্তমানে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে, যার মধ্যে ক্রিমিয়াও রয়েছে। সম্প্রতি ট্রাম্প দাবি করেছেন, শান্তিচুক্তিতে রাশিয়া আগ্রহী হলেও ইউক্রেন ততটা নয়। তবে ইউরোপীয় মিত্রদের মতে, যুদ্ধ থামাতে কিয়েভের চেয়ে মস্কোর অনীহাই বেশি।
এক ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষকের ভাষায়—যুদ্ধ শুরু করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু শেষ করা সবচেয়ে কঠিন কাজ।ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের এক বছর পূর্ণ হলেও তার বহুল আলোচিত ‘২৪ ঘণ্টায় যুদ্ধ বন্ধ’-এর প্রতিশ্রুতি এখনো বাস্তবতার আলো দেখেনি।
-আফরিনা সুলতানা










