চীনের আকাশে একদিকে যেমন নতুন রেকর্ড গড়ার আনন্দ, অন্যদিকে তেমনই দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ঘনঘটা। ২০২৫ সালে দেশটির অর্থনীতি সরকারের নির্ধারিত ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছুঁয়ে ফেললেও, মুদ্রার উল্টো পিঠে জন্মহার নেমে এসেছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে। আজ সোমবার (১৯ জানুয়ারি) দেশটির জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত তথ্য থেকে এই আশঙ্কাজনক চিত্র ফুটে উঠেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে চীনের জন্মহার প্রতি হাজারে মাত্র ৫.৬৩ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। এটি ২০২৩ সালের রেকর্ড ৬.৩৯ শতাংশের চেয়েও কম। গত বছর দেশটিতে মাত্র ৭.৯২ মিলিয়ন শিশু জন্মগ্রহণ করলেও মৃত্যুর সংখ্যা ছিল ১১.৩১ মিলিয়ন। ফলে টানা চতুর্থ বছরের মতো দেশটির জনসংখ্যা ৩.৩৯ মিলিয়ন কমে এখন ১.৪ বিলিয়নে দাঁড়িয়েছে।
জনসংখ্যাবিদরা বলছেন, ২০২৪ সালে জন্মহারে কিছুটা ইতিবাচক ইঙ্গিত দেখা গেলেও তা ছিল নিতান্তই সাময়িক। উচ্চ জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা এবং সন্তান লালন-পালনের চাপের কারণে তরুণ প্রজন্ম পরিবার গঠনে অনীহা প্রকাশ করছে। সরকার শিশু ভাতা ও আবাসন সহায়তায় কর ছাড়ের মতো নানা প্রণোদনা দিলেও তা নাগরিকদের মনে আস্থা ফেরাতে পারছে না।
জনসংখ্যাতাত্ত্বিক এই সংকটের বিপরীতে চীনের অর্থনৈতিক পারফরম্যান্স সবাইকে অবাক করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান বাণিজ্য যুদ্ধ এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে দুর্বল ভোগব্যয় সত্ত্বেও ২০২৫ সালে চীনের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রেকর্ড ১.২ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রধান কাং ই এই সাফল্যকে ‘উল্লেখযোগ্য স্থিতিশীলতা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। যদিও বছরের শেষ প্রান্তিকে প্রবৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে ৪.৫ শতাংশে নেমেছে, তবুও সামগ্রিকভাবে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনকে চীনের উচ্চ-মানের উন্নয়নের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে। মূলত রপ্তানির ব্যাপক উল্লম্ফনই চীনকে এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, চীনের বর্তমান অর্থনৈতিক সাফল্য মূলত রপ্তানিনির্ভর। কিন্তু অভ্যন্তরীণ আবাসন খাতের মন্দা এবং গ্রাহকদের কেনাকাটার প্রবণতা কমে যাওয়া দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকির কারণ হতে পারে। তার ওপর শ্রমশক্তি কমে যাওয়া এবং দ্রুত বর্ধনশীল বয়স্ক জনসংখ্যা চীনের উৎপাদনশীলতাকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিশ্ব অর্থনীতিতে দ্বিতীয় বৃহত্তম শক্তি হিসেবে টিকে থাকতে হলে চীনকে কেবল রপ্তানির ওপর ভরসা করলে চলবে না; বরং অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে পরিবার গঠনে উৎসাহিত করার জন্য আরও মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন।
-এম. এইচ. মামুন










