৫ হাজার প্রাণহানি : ঘুরবে নাকি পতন, খাদের কিনারায় ইরান

মুদ্রাস্ফীতি আর দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ইরানে এখন এক ভয়াবহ রক্তক্ষয়ী জনযুদ্ধে রূপ নিয়েছে। গত ২২ দিন ধরে চলা এই আন্দোলনে প্রাণহানির সংখ্যা নিয়ে তৈরি হয়েছে চরম বিতর্ক। সরকারি সূত্র ৫ হাজার মৃত্যুর কথা স্বীকার করলেও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, এই সংখ্যা ১৬ হাজার ছাড়িয়েছে। নজিরবিহীন এই দমন-পীড়ন ও পশ্চিমা বিশ্বের চাপের মুখে ইরান এখন আধুনিক ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সংকটের মুখোমুখি।

গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানে ব্যবসায়ীদের হাত ধরে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ দ্রুতই সাধারণ মানুষ ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও আকাশচুম্বী দ্রব্যমূল্যের প্রতিবাদ থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন এখন সরাসরি সরকারবিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। বিক্ষোভ দমনে তেহরান প্রশাসন নির্বিচারে গুলি, ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন এবং গণগ্রেপ্তারের পথ বেছে নিয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এই বিশৃঙ্খলা ও হত্যাযজ্ঞের জন্য সরাসরি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে দায়ী করেছেন। তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ‘অপরাধী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, হাজারো মানুষের মৃত্যুর পেছনে ওয়াশিংটনের হাত রয়েছে।

এর প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানে বর্তমান শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন চেয়েছেন। সংবাদমাধ্যম পলিটিকো-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, “ইরানে বর্তমান নেতৃত্ব পরিবর্তনের সময় এসে গেছে। এখন নতুন নেতৃত্ব খোঁজার সময়।”

আশ্চর্যের বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্য সমর্থন দিলেও আন্দোলনকারীদের একটি বড় অংশ ট্রাম্পের ওপর ক্ষুব্ধ। এনডিটিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনেক বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেছেন যে ট্রাম্প তাঁদের স্বপ্ন দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত কোনো কার্যকর সহায়তা দেননি। তাঁদের ভাষায়, “ট্রাম্প আমাদের বোকা বানিয়েছেন, তিনি প্রতারণা করেছেন।”

কানাডাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য ন্যাশনাল পোস্ট-এর এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান কঠোর দমনের মুখে বিক্ষোভ কিছুটা স্তিমিত মনে হতে পারে, কিন্তু তরুণ প্রজন্মের ক্ষোভ ও শোক সহজে প্রশমিত হওয়ার নয়। বিশ্লেষকদের মতে, শাসনকাঠামো টিকে গেলেও এই আন্দোলন খামেনি প্রশাসনের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীতে বড় ধরনের ভাঙন বা দেশজুড়ে দীর্ঘস্থায়ী ধর্মঘট ছাড়া বর্তমান সরকারকে উপড়ে ফেলা কঠিন হলেও, জনগণের ক্ষোভের প্রকৃত সমাধান না করলে সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে।

ইরান কি এই খাদের কিনারা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, নাকি নতুন কোনো বৈশ্বিক সংঘাতের কেন্দ্রে পরিণত হবে—তা এখন কোটি টাকার প্রশ্ন।

সূত্রঃ পলিটিকো

-এম. এইচ. মামুন