স্পেনে দ্রুতগতির দুটি ট্রেনের সংঘর্ষে অন্তত ২১ জন নিহত এবং ৭০-এর বেশি মানুষ আহত হয়েছেন। স্থানীয় সময় গতকাল রোববার দক্ষিণ স্পেনে এ দুর্ঘটনা ঘটে। দেশটির জরুরি সেবা বিভাগ এ তথ্য জানিয়েছে।
স্পেনের রেল কর্তৃপক্ষ অ্যাডিফ নিজেদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানায়, মালাগা থেকে মাদ্রিদগামী একটি দ্রুতগতির ট্রেন আদামুজ শহরের কাছে লাইনচ্যুত হয়। তা বিপরীত লাইনে ঢুকে উল্টো দিক থেকে আসা আরেকটি ট্রেনকে ধাক্কা দেয়। ফলে ওই ট্রেনটিও লাইনচ্যুত হয়।
পুলিশের এক মুখপাত্র বার্তা সংস্থা এএফপিকে প্রাথমিকভাবে ৫ জন নিহত হওয়ার কথা জানান। কিন্তু পরে নিহত মানুষের বেড়ে দাঁড়ায় ২১।
আন্দালুসিয়ার দক্ষিণাঞ্চলের জরুরি সেবা বিভাগের প্রধান আন্তোনিও সানজ জানান, দুর্ঘটনায় অন্তত ৭৩ জন আহত হয়েছেন। স্পেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম বলছে, অনেক যাত্রী ট্রেনের বগিতে আটকা পড়েছেন। তাঁদের নিয়ে আহত মানুষের সংখ্যা বেড়ে ১০০-তে পৌঁছাতে পারে।
রাষ্ট্রায়ত্ত সম্প্রচারমাধ্যম আরএনই’র এক সাংবাদিক দুর্ঘটনাকবলিত দুই ট্রেনের একটিতে ছিলেন। তিনি বলেন, সংঘর্ষের মুহূর্ত তাঁর কাছে ‘ভূমিকম্পের মতো’ মনে হয়েছে। আটকা পড়া যাত্রীরা জরুরি হাতুড়ি দিয়ে বগির জানালা ভেঙে বের হতে চেষ্টা করেন।
প্রথম ট্রেনের যাত্রী ছিলেন লুকাস মেরিয়াকো নামের এক ব্যক্তি। তিনি লা সেক্সটা টেলিভিশনকে বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি আমার কাছে হরর মুভির মতো মনে হয়েছে। পেছন থেকে প্রচণ্ড একটি ধাক্কা লাগে। মনে হলো, পুরো ট্রেন যেন ভেঙে পড়ছে। কাচের কারণে অনেকে আহত হয়েছেন।’
স্পেনের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, দুই ট্রেন মিলিয়ে প্রায় ৪০০ যাত্রী ছিলেন।
দুর্ঘটনার কারণে মাদ্রিদ, সেভিয়া, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা রুটের উচ্চগতির রেলসেবা অন্তত আজ সোমবার পর্যন্ত পুরোপুরি বন্ধ থাকবে বলে জানিয়েছে অ্যাডিফ। এসব শহরের স্টেশনে ভুক্তভোগীদের পরিবার ও স্বজনদের সহায়তার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
রাজ প্রাসাদ এক্সে এক বার্তায় জানিয়েছে, রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ ও রানি লেতিসিয়া এ দুর্ঘটনায় ‘গভীর দুঃখ’ প্রকাশ করেছেন। তাঁরা হতাহত ব্যক্তিদের পরিবার ও স্বজনদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন এবং আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেছেন।
স্পেনের উচ্চগতির রেল নেটওয়ার্কের দৈর্ঘ্য প্রায় ৩ হাজার কিলোমিটার, যা ইউরোপে সবচেয়ে বড়। পৃথক ট্র্যাকে এ নেটওয়ার্ক মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, সেভিয়া, ভ্যালেন্সিয়া, মালাগাসহ দেশটির প্রধান শহরগুলোকে যুক্ত করেছে।
কর্ডোবা ফায়ার সার্ভিসের প্রধান ফ্রান্সিসকো কারমোনা স্প্যানিশ পাবলিক ব্রডকাস্টার আরটিভিইকে বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রে মরদেহ সরিয়ে জীবিতদের উদ্ধার করতে হয়েছে। এটি অত্যন্ত কঠিন এবং জটিল কাজ।’
রেল নেটওয়ার্ক অপারেটর আদিফের তথ্যমতে, স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে মালাগা থেকে ছাড়ার প্রায় ১০ মিনিট পর দুর্ঘটনাটি ঘটে। আতোচা, সেভিল, কর্ডোবা, মালাগা ও হুয়েলভা স্টেশনে ভুক্তভোগীদের স্বজনদের সহায়তার জন্য বিশেষ বুথ ও তথ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার পর মাদ্রিদ ও আন্দালুসিয়ার মধ্যকার সমস্ত ট্রেন চলাচল স্থগিত করা হয়েছে। সোমবারও এই রুট বন্ধ থাকবে। রেল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিপাকে পড়া যাত্রীদের সুবিধার্থে স্টেশন টার্মিনালগুলো রাতভর খোলা রাখা হবে।
ইতালীয় রেল কোম্পানি ফেরোভি ডেলো স্ট্যাটো-র একজন মুখপাত্র রয়টার্সকে জানান, দুর্ঘটনায় পড়া ট্রেনটি ছিল ফ্রেসিয়া ১০০০ মডেলের। অত্যাধুনিক এই ট্রেন ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ৪০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারে।
স্প্যানিশ রেড ক্রস দুর্ঘটনাস্থলে জরুরি সহায়তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে মানসিক সান্ত্বনা ও কাউন্সেলিং দিচ্ছে।
আরটিভিইর সাংবাদিক সালভাদর জিমনেজ নিজে ওই ট্রেনের যাত্রী ছিলেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনার মুহূর্তটি তার কাছে ‘ভূমিকম্পের’ মতো মনে হয়েছে।
জিমনেজ বলেন, ‘আমি প্রথম বগিতে ছিলাম। হঠাৎ এক প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে মনে হলো যেন ভূমিকম্প হচ্ছে, তখনই বুঝতে পারলাম ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছে।’
স্পেনের রাজা ষষ্ঠ ফিলিপ ও রানি লেতিজিয়া বলেন, তারা অত্যন্ত উদ্বেগের সঙ্গে এই বিপর্যয়ের খবর রাখছেন।
ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ ও ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লিয়েনও এই ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন।
এর আগে ২০১৩ সালে স্পেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় গ্যালিসিয়ায় দেশটির ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ উচ্চগতির ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল। সেই দুর্ঘটনায় ৮০ জন নিহত ও ১৪০ জন আহত হয়েছিলেন।
এএফপি
-মামুন










