
বাজারের চাহিদা, অপারেশনাল সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবসায়িক পরিকল্পনার আলোকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মো. সাফিকুর রহমান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সিদ্ধান্তের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক বিষয় জড়িত নয়।
শনিবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, উড়োজাহাজ ক্রয়ের আগে বহরের উপযোগিতা, রক্ষণাবেক্ষণ সুবিধা, অর্থায়নের সম্ভাব্য পথ, সরবরাহের সময়সূচি এবং দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা—সব দিক গভীরভাবে মূল্যায়ন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, গত ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিমানের বার্ষিক সাধারণ সভায় (এজিএম) উড়োজাহাজ কেনার নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন উপদেষ্টা, যিনি একই সঙ্গে বিমানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান।
অনুমোদিত পরিকল্পনার আওতায় আটটি বোয়িং ৭৮৭-১০, দুটি বোয়িং ৭৮৭-৯ এবং চারটি বোয়িং ৭৩৭-৮ ম্যাক্স উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে জানান বিমান সিইও।
ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ প্রসঙ্গে ড. সাফিকুর রহমান বলেন, বিমানের কৌশলগত পরিকল্পনায় বাজার চাহিদা ও কার্যক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রুট নেটওয়ার্ক উন্নয়নের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক রুটে সক্ষমতা বাড়ানো এবং প্রবাসী ও ব্যবসায়িক যাত্রীর চাপ বেশি এমন গন্তব্যে সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বাজার বিমানের জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। এই অঞ্চলে প্রবাসী যাত্রী, রেমিট্যান্স প্রবাহ, ট্রানজিট যাত্রী এবং কার্গো পরিবহনের সম্ভাবনা বেশি থাকায় সেখানে বহর সম্প্রসারণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বাজার বিশ্লেষণ ও বহর পরিকল্পনার ভিত্তিতে নতুন রুট ধাপে ধাপে চালু করা হবে।
নিজের মেয়াদে অর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক এভিয়েশন খাতে চ্যালেঞ্জপূর্ণ সময়ে বিমানে আর্থিক শৃঙ্খলা ও অপারেশনাল স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা একটি বড় সাফল্য। টেকসই মুনাফা অর্জন, নিরবচ্ছিন্ন ফ্লাইট পরিচালনা, উড়োজাহাজের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ জোরদার করা সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
উচ্চ ভাড়া ও যাত্রীসংখ্যা কমে যাওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে ড. সাফিকুর রহমান বলেন, অতীতে টিকিট বিক্রিতে সিন্ডিকেটের প্রভাবের কারণে কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি ও স্বচ্ছতার ঘাটতি ছিল। বর্তমানে স্বচ্ছ অনলাইন টিকিটিং ব্যবস্থা, উন্নত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং ফ্লাইট ফ্রিকোয়েন্সি সমন্বয়ের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
বিমানের সাম্প্রতিক মুনাফা অর্জনের বিষয়ে তিনি বলেন, কঠোর ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, বহরের দক্ষ ব্যবহার, রুট পুনর্বিন্যাস এবং শক্তিশালী রাজস্ব ব্যবস্থাপনার দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপের ফলেই এই সাফল্য এসেছে। এতে পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তিনি আরও জানান, জ্বালানি ব্যবহারে দক্ষতা বাড়ানো, সেবা চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন, অপ্রয়োজনীয় অপারেশনাল ক্ষতি কমানো এবং আর্থিক তদারকি জোরদার করা হয়েছে। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা পুনরুদ্ধার ও পরিকল্পিত সক্ষমতা ব্যবস্থাপনাও ঘুরে দাঁড়াতে সহায়ক হয়েছে।
জেট ফুয়েলের বকেয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এটি বহু বছরের পুরোনো একটি সমস্যা। তবে দৈনন্দিন কার্যক্রম ব্যাহত না করে কাঠামোবদ্ধ উপায়ে বকেয়া পরিশোধ করা হচ্ছে। বর্তমানে প্রতি মাসে ২৫ কোটি টাকা পরিশোধের পাশাপাশি নগদ ভিত্তিতে জ্বালানি কেনা হচ্ছে।
ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট পুনরায় চালুর বিষয়ে তিনি বলেন, ননস্টপ এই সেবা যাত্রীদের সময় ও খরচ সাশ্রয় করবে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন শহর হয়ে দীর্ঘ ট্রানজিটের ঝামেলা কমাবে।
তিনি জানান, সরাসরি ঢাকা-করাচি ফ্লাইট চালু হলে যাত্রা সময় ১৩ ঘণ্টা থেকে কমে প্রায় ৪ থেকে সাড়ে ৪ ঘণ্টায় নেমে আসবে।
বিমান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পুনরায় চালু হওয়া ঢাকা-করাচি রুটটি প্রাথমিকভাবে ২৯ জানুয়ারি থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে পরিচালিত হবে। এই সময়ে যাত্রী চাহিদা, লোড ফ্যাক্টর ও বাণিজ্যিক কার্যকারিতা বিশ্লেষণ করে রুটটির স্থায়িত্ব বা ফ্লাইট সংখ্যা বাড়ানোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
উল্লেখ্য, ধারাবাহিক লোকসান ও যাত্রী সংকটের কারণে ২০১২ সালে ঢাকা-করাচি রুটে ফ্লাইট বন্ধ করা হয়েছিল। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, অতীত অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া শিক্ষা এবার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সতর্কতার সঙ্গে কাজে লাগানো হবে।
–আফরিনা সুলতানা/









