বৈশ্বিক ইন্টারনেট স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ চালুর চূড়ান্ত পরিকল্পনা ইরানের

ইরান সরকার দেশটিকে বৈশ্বিক ইন্টারনেট ব্যবস্থা থেকে স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে একটি সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রিত ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ ব্যবস্থা চালুর চূড়ান্ত পরিকল্পনা করছে। ডিজিটাল অধিকারকর্মীদের দাবি, ২০২৬ সালের পর থেকে ইরানে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার আর সাধারণ নাগরিক অধিকার হিসেবে থাকবে না; বরং এটি কেবল সরকারের বিশেষ অনুমোদনপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের জন্য ‘রাষ্ট্রীয় বিশেষাধিকার’ হিসেবে গণ্য হবে।

ইরানের ইন্টারনেট সেন্সরশিপ পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ‘ফিল্টারওয়াচ’ তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই গোপন পরিকল্পনাকে ‘ব্যারাক ইন্টারনেট’ বা ‘সিল করা ইনট্রানেট’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির প্রধান আমির রাশিদি জানিয়েছেন, নতুন এই ব্যবস্থায় সাধারণ নাগরিকদের কেবল ‘জাতীয় ইন্টারনেট’-এ সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। যারা সরকারের কঠোর নিরাপত্তা ছাড়পত্র পাবেন, কেবল তারাই নির্দিষ্ট কিছু আন্তর্জাতিক সাইট ব্যবহারের সুযোগ পাবেন।

এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ‘হোয়াইটলিস্টিং’। যেখানে আগে সরকার ক্ষতিকর সাইটগুলো ব্লক করত, সেখানে নতুন পদ্ধতিতে কেবল সরকার অনুমোদিত হাতেগোনা কয়েকটি সাইট খোলা থাকবে, বাকি সবকিছু ডিফল্টভাবে বন্ধ থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, গত ১৬ বছর ধরে ধাপে ধাপে এই কাঠামো তৈরি করেছে তেহরান। প্রজেক্ট আইনিটা ও আউটলাইন ফাউন্ডেশনের গবেষকেরা জানিয়েছেন, এই নজরদারি ব্যবস্থায় চীন সরাসরি প্রযুক্তিগত সহায়তা দিচ্ছে। উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ‘মিডলবক্স’ নামক যন্ত্র ব্যবহার করে পুরো দেশের ইন্টারনেট ট্রাফিক পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এর ফলে ভিপিএন ব্যবহার করেও সেন্সরশিপ এড়ানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। এই জাতীয় ইন্টারনেটে নিজস্ব মেসেজিং অ্যাপ, সার্চ ইঞ্জিন এবং ভিডিও স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম রাখা হয়েছে, যা পুরোপুরি রাষ্ট্রের নজরদারির আওতাভুক্ত।

গত ৮ জানুয়ারি থেকে ইরানে শুরু হওয়া ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ইতিমধ্যে ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘতম শাটডাউনে পরিণত হয়েছে। নেটব্লকসের তথ্যমতে, এটি ২০১১ সালে মিসরের তাহরির স্কয়ার আন্দোলনের সময়কার শাটডাউনের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে গেছে।

ইরানি নববর্ষ বা ‘নওরোজ’ (২০ মার্চ ২০২৬) পর্যন্ত এই অচলাবস্থা চলতে পারে বলে সরকারি মুখপাত্র ফাতেমেহ মোহাজেরানি ইঙ্গিত দিয়েছেন। এই সুযোগেই সরকার তাদের নতুন ডিজিটাল অবকাঠামো স্থাপনের কাজ সম্পন্ন করছে। এদিকে তথ্যের অভাবে নিহতের সঠিক সংখ্যা জানা না গেলেও বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে, সাম্প্রতিক দমনে নিহতের সংখ্যা ১২ হাজার থেকে ২০ হাজারের কাছাকাছি হতে পারে।

এই স্থায়ী বিচ্ছিন্নতার সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি মুখ থুবড়ে পড়েছে দেশটির ডিজিটাল অর্থনীতি। ফিল্টারওয়াচের প্রতিবেদন অনুযায়ী, শিপিং কোম্পানি থেকে শুরু করে ক্ষুদ্র অনলাইন ব্যবসায়ীরা দেউলিয়া হওয়ার পথে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, সরকার অর্থনৈতিক ক্ষতির চেয়ে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে। ২০০৯ সালের আন্দোলনের পর থেকে যে ‘জাতীয় ইন্টারনেট’ গড়ার কাজ শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা চূড়ান্ত রূপ নিতে যাচ্ছে।

-এম. এইচ. মামুন