নববর্ষের প্রথম প্রহরে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামের ঐতিহাসিক ভন্ডেলকার্ক (Vondelkerk) মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আগুনে পুড়ে গির্জার বড় একটি অংশ ধ্বংস হয়ে যায় এবং ১৫০ বছরের পুরোনো নব্য-গথিক এই স্থাপনার চূড়া (স্পায়ার) ধসে পড়ে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।
মধ্যরাতের কিছুক্ষণ পর ভন্ডেলস্ট্রাটে অবস্থিত গির্জাটিতে আগুন লাগে। দ্রুত ছড়িয়ে পড়া আগুন কাঠের অভ্যন্তর ও ছাদ গ্রাস করে নেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, আগুনের লেলিহান শিখার মধ্যে রাতের আকাশে দাঁড়িয়ে থাকা গির্জার ৫০ মিটার উঁচু টাওয়ারটি একপর্যায়ে ভেঙে পড়ছে।
আমস্টারডাম নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, মূল কাঠামোর কিছু অংশ দাঁড়িয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ছাদ সম্পূর্ণরূপে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রাথমিক মূল্যায়নে ভবনটিকে পুনরুদ্ধারের অযোগ্য বলে মনে করা হচ্ছে। আগুন লাগার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি।
এই অগ্নিকাণ্ড ঘটে নেদারল্যান্ডসজুড়ে সহিংস ও বিশৃঙ্খল নববর্ষ উদযাপনের প্রেক্ষাপটে। দেশজুড়ে আতশবাজি সংক্রান্ত দুর্ঘটনা, সহিংসতা এবং জরুরি সেবাকর্মীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে। ডাচ পুলিশ ইউনিয়নের প্রধান নাইন কুইমান বলেন, এটি ছিল ‘অভূতপূর্ব মাত্রার সহিংসতা’। তিনি জানান, আমস্টারডামে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিজেও আতশবাজির আঘাতে তিনবার আক্রান্ত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে মধ্যরাতের পরপরই সরকার বিরল এক জাতীয় মোবাইল সতর্কবার্তা জারি করে, যেখানে নাগরিকদের জীবনহানির আশঙ্কা না থাকলে জরুরি নম্বরে ফোন না করার আহ্বান জানানো হয়।
নববর্ষের রাতে আতশবাজি দুর্ঘটনায় অন্তত দুজনের মৃত্যু হয়েছে—একজন ১৭ বছর বয়সী কিশোর এবং একজন ৩৮ বছর বয়সী পুরুষ। আরও কয়েকজন গুরুতর আহত হন। রটারডামের একটি চক্ষু হাসপাতালে বহু রোগী ভর্তি হয়, যাদের মধ্যে কয়েকজনের অস্ত্রোপচার প্রয়োজন হয়। আতশবাজি নিষিদ্ধ বা ফায়ারওয়ার্ক-ফ্রি জোন হিসেবেও ঘোষিত এলাকায় ভোর পর্যন্ত বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।
১৮৭২ থেকে ১৮৮০ সালের মধ্যে নির্মিত ভন্ডেলকার্কটি নেদারল্যান্ডসের বিখ্যাত স্থপতি পিয়ের কুইপার্সের নকশায় তৈরি। এটি প্রথমে একটি ক্যাথলিক প্যারিশ চার্চ হিসেবে ব্যবহৃত হতো এবং পরে জাতীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সাম্প্রতিক দশকগুলোতে এটি ধর্মীয় উপাসনালয়ের পাশাপাশি প্রদর্শনী, কনসার্ট ও বিভিন্ন জনসমাগমমূলক অনুষ্ঠানের স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছিল।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা জানান, ভবনটির প্রাচীন কাঠামো ও কাঠের ব্যবহার একে আগুনের প্রতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছিল। উল্লেখযোগ্যভাবে, ১৯০৪ সালেও বজ্রপাতের কারণে আগুনে গির্জাটির মূল চূড়া ধ্বংস হয়েছিল, যা পরে পুনর্নির্মাণ করা হয়।
ভন্ডেলকার্ক ধ্বংসের ঘটনা ইউরোপজুড়ে আতশবাজির অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে নববর্ষ উদযাপনের সময় প্রাণহানির খবর এসেছে।
আমস্টারডাম যখন ক্ষয়ক্ষতির হিসাব করছে, তখন ভন্ডেলকার্কের ক্ষতিকে কেবল একটি ঐতিহাসিক ভবনের ধ্বংস হিসেবেই নয়, বরং ইতিহাস ও সমকালীন সংস্কৃতির মিলনস্থল হারানোর বেদনাদায়ক ঘটনা হিসেবেও দেখা হচ্ছে।
এম এম সি/










