টেলিভিশনের পর্দায় সেই চিরচেনা গল্প, যেখানে রুটিন করে নাটক দেখতেন দর্শকরা। নির্দিষ্ট সময়ে টিভি সেটের সামনে বসা ছিল নিত্যদিনকার অভ্যাস। এখন সেই অভ্যাসে স্থান করে নিয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত ওয়েব সিরিজ ও ইউটিউব চ্যানেলেগুলোতে । দর্শকের চাহিদা, নির্মাতার দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রযুক্তির ছোঁয়ায় নাটক আর আগের মতো নেই। বদলেছে ফরম্যাট, বদলেছে উপস্থাপনার ধরন। তৈরি হয়েছে এক নতুন ভাষা, গল্প বলার মাধ্যমও।
টিভি নাটকে এক সময় ঘরোয়া জীবনের আবেগ ও পারিবারিক গল্পের পাশাপাশি, প্রেম-ভালোবাসা, মান-অভিমানের বিষয়গুলো উঠে আসত। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষপটে নাটকে ঘুরেফিরে এক প্যাঁচালেই আটকে থাকছে কাহিনি। দর্শকদের বড় একটি অংশ এ ধরনের নাটকে এখন ক্লান্ত। তাদের চোখ এখন খুঁজে ফেরে ভিন্নমাত্রার গল্প, বাস্তবতাকে তুলে ধরার সাহস এবং কারিগরি উৎকর্ষ। এ চাহিদা পূরণে এগিয়ে এসেছে ওটিটি কনটেন্টগুলো। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম ও ইউটিউব প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত কনটেন্টে সবাই এখন গল্পে বৈচিত্র্য আনতে আগ্রহী। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়েই এসেছে ফরম্যাটের এ পরিবর্তন।
সাধারণত টিভিতে প্রচারিত একক নাটক ৩০-৫০ মিনিটের হয়ে থাকে, ধারাবাহিক নাটক ৫০-এর বেশি পর্বের হতেও দেখা গেছে। এসব নাটকে দেখা যায় ঘুরে ফিরে একই গল্প। তাতে থাকে কমেডি ঘরানার আধিক্য। কাতুকুতু দিয়ে দর্শক হাসানোর প্রতিযোগিতা।
টিভি নাটকের জনপ্রিয়তাকে পাশ কাটিয়ে ওয়েব সিরিজগুলো দর্শক আগ্রহে আসার পেছনে বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য কারণও রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টিভি নাটকের গল্পে একঘেয়েমি, অল্প সময়ে নির্মাণ, বিজ্ঞাপনের জন্য নাটকে কাটাছেঁড়া-এ সবই মানহীন নাটক বাড়িয়ে দিয়েছে; যা দর্শক বিমুখতার অন্যতম কারণ। পাশাপাশি ওয়েব সিরিজে স্বাধীনভাবে গল্প বলার স্বাধীনতায় দর্শক আগ্রহ বাড়াচ্ছে।
নাট্যনির্মাতা জানান, টিভি চ্যানেলকে খুশি করতে গিয়ে অনেক সময় গল্পের মান নষ্ট হয়ে যায়। সময় নেই, বাজেট নেই, তবু নাটক করতে হয়। এটা কাজ নয়, শুধু যেন দেনা শোধ করা মাত্র। এদিকে প্রত্যেকটা নাটক বানানোর সময় আরও একটি বিষয়ও মাথায় রাখতে হয়, বিজ্ঞাপনদাতার পছন্দ কী, সময়সীমা কতটুকু, টিভি প্রিভিউ কমিটি কতটা কাঁচি চালাবে। এসব সীমাবদ্ধতায় শিল্পের স্বাধীনতা খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
টিভি নাটকের এ ক্রান্তিকালের মধ্যে ওটিটি যেন নতুন আশা সঞ্চার করছে। ওয়েব সিরিজগুলো যেমন দর্শক টানছে, তেমনই নির্মাতাদেরও দিয়েছে গল্প বলার স্বাধীনতা। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম আসার পর থেকে আরও একটি বিষয় ইতিবাচক সাড়া ফেলেছে। নতুন মুখের আবির্ভাবে প্রাণবন্ত হয়ে উঠছে এ মাধ্যমটি। টিভি নাটকে যারা সুযোগ পেতেন না, তারাই এখন ওয়েবে জনপ্রিয়। বিশেষত চিত্রনাট্যকারদের স্বাধীনতা, নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করার সীমাবদ্ধতা না থাকায় গল্পের গভীরে ঢোকার সুযোগ পাচ্ছেন তারা।
নির্মাতা সাগর জাহান বলেন, ‘নাটকের মাধ্যম বদলেছে, তবে গল্প বলার দায় বদলায়নি। ওয়েবে স্বাধীনতা আছে, কিš‘ সে স্বাধীনতাকে শিল্পে রূপ দেওয়াটাই বড় চ্যালেঞ্জ। সেই চ্যালেঞ্জ উতরে বেশ কিছু ভালো কনটেন্ট আসছে। কিš‘ সামাজিক দায় বোধ থেকে সরে গেলেও চলবে না। নতুন ফরম্যাটে গল্প বলতে গিয়ে আমরা যেন অতিরঞ্জিত কিছু না করি। যা আমাদের ক্ষতির কারণ হয়।’
অভিনেতা আজিজুল হাকিম বলেন, ‘টিভি নাটক এখনো সব শ্রেণির মানুষের জন্য। ওয়েব সিরিজ শহুরে দর্শকের জন্য দারুণ, কিš‘ আমরা ভুলে যাই, ঢাকার বাইরেও দর্শকদের বড় একটি অংশ আছে। এটা ঠিক গল্প বলার ধরন দুটোর আলাদা। দুটিই আমাদের বিনোদনের খোরাক দিচ্ছে । তাই এর অবস্থান সমান পর্যায়ে রয়েছে বলেই মনে করি।’
জনপ্রিয় অভিনেতা মোশাররফ করিম বলেন, ‘টিভি নাটকে এখন সময় নেই, ধৈর্য নেই। ওটিটিতে চরিত্র নিয়ে কাজ করার সময় পাওয়া যায়। কসেন্সরের অভাবে কিছু নির্মাণ অতিরিক্ত দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চায়। গল্প বলার ঢংয়ে আনে পরিবর্তন। তবে তাদের নিজস্ব একটা স্টাইল রয়েছে। যেটি টিভি নাটকের সঙ্গে মেলানো কঠিন।’
সংশ্লিষ্টরা জানান, ওয়েব সিরিজ ও টিভি নাটক একে অপরকে প্রতিযোগী নয়, বরং পরিপূরক করে তুলতে পারে। পরিবারকেন্দ্রিক গল্প ও জাতীয় দিবসভিত্তিক নাটকে এখনো টেলিভিশন অপরিহার্য। অন্যদিকে যুগোপযোগী গল্প তুলে ধরতে ওয়েব মাধ্যমের বিকল্প নেই। বাংলাদেশের নাটকের ফরম্যাটে এ পরিবর্তন সময়ের দাবি ছিল।
মাহমুদ সালেহীন খান










