ঘড়ির আদ্যোপান্ত

সময় দেখা যায় না, ধরা যায় না; অথচ মানুষের জীবনে সবচেয়ে শক্তিশালী নিয়ামক এই সময়ই। কখন সূর্য উঠল, কখন নামল এই প্রশ্ন দিয়েই শুরু হয়েছিল সময় মাপার মানুষের কৌতূহল। সেই কৌতূহল আজ এসে ঠেকেছে হাতে বাঁধা স্মার্টওয়াচে, যা শুধু সময় নয়, মানুষের হৃদস্পন্দন পর্যন্ত গুনে দেয়। এই গল্প সময়ের নয় শুধু, মানুষের বুদ্ধি, প্রয়োজন আর সভ্যতার অগ্রগতির গল্প।

ছায়ায় সময়ের প্রথম পাঠ

সভ্যতার শুরুতে মানুষ বুঝতে শিখেছিল সূর্যের অবস্থান বদলালে সময়ও বদলায়। গাছের ছায়া লম্বা হলে সকাল, ছোট হলে দুপুর এই সাধারণ পর্যবেক্ষণ থেকেই তৈরি হয় সূর্যঘড়ি। মাটিতে পোঁতা একটি খুঁটির ছায়া দেখে সময় নির্ধারণ করা হতো।

প্রাচীন মিসর, ব্যাবিলন ও গ্রিসে সূর্যঘড়ির ব্যবহার ছিল ব্যাপক। তবে এর একটি বড় সীমাবদ্ধতা ছিল রাত নামলে কিংবা আকাশ মেঘে ঢেকে গেলে সূর্যঘড়ি পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ত।

জলঘড়ির ব্যবহার

সূর্যের ওপর নির্ভরতা কাটাতে মানুষ খুঁজে নেয় নতুন উপায়। তখন আবিষ্কৃত হয় জলঘড়ি। একটি পাত্র থেকে আরেকটি পাত্রে নির্দিষ্ট গতিতে পানি পড়ত, আর সেই পানির স্তর দেখেই সময় বোঝা হতো। মিসর, চীন ও ভারতীয় উপমহাদেশে জলঘড়ির ব্যবহার ছিল বেশ প্রচলিত। তবে শীতকালে পানি জমে যাওয়া এবং পানির প্রবাহের তারতম্যের কারণে এই পদ্ধতিও পুরোপুরি নির্ভরযোগ্য ছিল না।

বালিঘড়ির যুগ

পরবর্তী ধাপে আসে বালিঘড়ি। দুই কাচের পাত্রের মাঝে চিকন ছিদ্র দিয়ে বালি পড়ে নির্দিষ্ট সময় নির্দেশ করত। বালিঘড়ির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল এটি বহনযোগ্য এবং সমুদ্রযাত্রায়ও কার্যকর। নাবিকরা দিক নির্ণয় ও পালা বদলের সময় হিসাব রাখতে বালিঘড়ি ব্যবহার করত। তবু এটি শুধু নির্দিষ্ট সময়সীমা মাপতে পারত, পুরো দিনের সময় নয়।

মোমের আলোয় সময়ের পরিমাপ

নবম শতকে ইউরোপে ব্যবহৃত হয় মোমঘড়ি। নির্দিষ্ট দৈর্ঘ্যের মোম কতক্ষণে পুড়ে শেষ হয় তা দিয়েই সময় নির্ধারণ করা হতো। অনেক সময় মোমে দাগ কেটে ঘণ্টা ভাগ করা থাকত। এই পদ্ধতি ছিল সহজ, কিন্তু বাতাস ও তাপমাত্রার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় এটি খুব নিখুঁত ছিল না।

যন্ত্রের হাতে সময়ের নিয়ন্ত্রণ

সময় মাপার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে যান্ত্রিক ঘড়ির মাধ্যমে। মধ্যযুগে ইউরোপের গির্জা ও শহরের টাওয়ারে প্রথম এই ঘড়ি বসানো হয়। ভারী ধাতব গিয়ার আর ওজনের সাহায্যে এটি চলত। ১৬শ শতকে জার্মানির পিটার হেনলেইন তৈরি করেন প্রথম বহনযোগ্য যান্ত্রিক ঘড়ি। এরপর ঘড়িতে যুক্ত হয় মিনিট ও সেকেন্ডের কাঁটা।

পেনডুলাম ঘড়ির বিপ্লব

১৬৫৬ সালে বিজ্ঞানী হিউজেনস আবিষ্কার করেন পেনডুলাম ঘড়ি। দোলকের নির্দিষ্ট ছন্দ সময় মাপাকে করে তোলে অনেক বেশি নির্ভুল। এই আবিষ্কার বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনা।

আধুনিক ঘড়ির যাত্রা

২০শ শতকে আসে কোয়ার্টজ ও ডিজিটাল ঘড়ি। কাঁটার বদলে সংখ্যায় সময় দেখানো শুরু হয়। নির্ভুলতা বাড়ে কয়েকগুণ। ঘড়ি তখন শুধু প্রয়োজন নয়, হয়ে ওঠে ফ্যাশন ও ব্যক্তিত্বের অংশ।

স্মার্টওয়াচের যুগ

আজকের ঘড়ি আর শুধু সময় জানায় না। স্মার্টওয়াচ মানুষের ঘুম, হাঁটার সংখ্যা, হার্টবিট এমনকি অক্সিজেন লেভেলও পরিমাপ করে। মোবাইল ফোনের অনেক কাজই এখন ঘড়ির পর্দায় চলে এসেছে।

সূর্যের ছায়া থেকে শুরু করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ঘড়ির এই দীর্ঘ যাত্রা আসলে মানুষের সময়কে নিয়ন্ত্রণে আনার গল্প। ঘড়ি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, কিন্তু সময়ের মূল্য বদলায়নি। সময় কখনো থামে না মানুষই কেবল তাকে ধরার চেষ্টা করে।

সাবরিনা রিমি/